মোঃ ফিরোজ আহমেদ, পাইকগাছা : দক্ষিণঞ্চলে এক সময়ের খেজুরের রস-গুড়ের জন্য বিখ্যাত খুলনার উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপ, এখন সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। কৃষি জমিতে লোনা পানির মারাত্মক প্রভাব, অপরিকল্পিত গাছ কাটা ও নতুন চারা রোপণে অনীহার কারণে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে খেজুর গাছ। শীতকালে ভোরবেলার টাটকা রসের হাঁড়ি এখন এই অঞ্চলের গ্রাম থেকে প্রায় উধাও।
লবণাক্ততা ও নির্বিচার গাছ কাটা এর মূল কারণ স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই অঞ্চল থেকে খেজুর গাছ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো:
লবণ পানির প্রভাব: উপকূলীয় এলাকায় লোনা পানির প্রবেশ ও স্থায়িত্বের কারণে খেজুর গাছ মরে যাচ্ছে।
অপরিকল্পিত উন্নয়ন: বাড়ি নির্মাণ, রাস্তা প্রশস্তকরণ, দোকানপাট বৃদ্ধি এবং জমি পরিষ্কারের সময় নির্বিচারে পুরনো গাছ কেটে ফেলা।
নতুন গাছ না লাগানো: পুরনো গাছ বিলুপ্ত হলেও নতুন করে চারা রোপণের উদ্যোগ নেই। পুরাইকাটী গ্রামের বাসিন্দা নুর ইসলাম জানান, “গত ১০-১৫ বছরে এলাকায় লবণ পানির কারণে গাছ মরে যাওয়া, বাড়ি-রাস্তা তৈরির জন্য এবং জমি পরিষ্কারের সময় প্রচুর খেজুর গাছ কাটা হয়েছে। নতুন করে কেউ গাছ লাগায়নি, ফলে সংখ্যাটা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।”
ঐতিহ্যবাহী দৃশ্যের অবসান : এক সময় শীতকাল এলেই রামনগর, গড়ইখালী, চাঁদখালী, সোলাদানা, রাড়ুলী, হরিঢালীসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামে গ্রামে ভোরবেলা টাটকা রসের হাঁড়ি নিয়ে গাছিদের চিরচেনা দৃশ্য দেখা যেত। রামনগরের মো. আবুল বাশার (৬৫) আক্ষেপ করে বলেন, “আগে শীতে রস না খেলে দিন শুরু হতো না। এখন আমাদের গ্রামে মাত্র দু-তিনটা গাছ অবশিষ্ট আছে। গাছি নেই, রসও নেই।”
গড়ইখালীর কৃষক ইসমাইল গাজী এই পরিবর্তনকে ‘সাংস্কৃতিক ক্ষতি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “একসময় শত শত গাছে কোড়া বসতো। এখন খালি চোখে একটা-দুটো গাছ পাওয়া যায়।” চাঁদখালীর কলেজছাত্রী শারমিন আক্তার করেন, “আমরা ছোটবেলায় দাদার সাথে রস খেতে যেতাম। এখন ছোটরা রস কেমন তা জানেই না। মনে হচ্ছে ঐতিহ্যটা হারাচ্ছি।”
গাছি পেশায় ধস : গাছ কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী গাছি পেশা আজ বিপন্ন। পাইকগাছার প্রবীণ গাছি মতিউর রহমান বলেন, “গাছ নেই, তাই কাজও নেই। আগে আমি ৫০-৬০টা গাছে কোড়া বসাতাম। এখন হাতে গোনা ৫টা গাছেও কোড়া বসানোর পরিবেশ নেই।”
সংরক্ষণের দাবি ও স্থানীয় উদ্যোগ : এই সংকটে স্থানীয় সরকার এবং পরিবেশ কর্মীরা সচেতন হচ্ছেন। পাইকগাছা উপজেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) মনে করেন, “খেজুর গাছ সংরক্ষণ সময়ের দাবি। আমরা চাইলে রাস্তার ধারে, স্কুল-মাদ্রাসার আশেপাশে এবং পতিত জমিতে ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ লাগাতে পারি। এ নিয়ে স্থানীয় সরকারের সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ প্রয়োজন।”
ইতিবাচক খবর হিসেবে, হরিঢালী ইউনিয়ন পরিষদের এক জনপ্রতিনিধি জানান, “খেজুর গাছ শুধু ঐতিহ্য নয়, পরিবেশ রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী মৌসুমে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে অন্তত ৫০০ খেজুর গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।”