দৈনিক সংগ্রাম-এর খুলনা অফিসে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীদের হামলার ৭ম বছর আজ। ২০১৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, সেচ্ছাসেবকলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে অতর্কিতে নগরীর স্যার ইকবাল রোডস্থ খুলনা প্রেসক্লাব সংলগ্ন দৈনিক সংগ্রাম-এর খুলনা অফিসে দরজা ও তালা ভেঙে ঢুকে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। হামলাকারীরা প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে অফিসে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এ সময় আতংকে এলাকার দোকান-পাট বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের ব্যবসায়ীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়রা জানান, তৎকালীন মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আসাদুজ্জামান রাসেলের নেতৃত্বে ২৫/৩০ জন সশস্ত্র ক্যাডার অফিসের নীচে আসে। একটি গ্রুপ অফিসের দোতলায় চলে যায়। আরেকটি গ্রুপ নীচে পাহারা দেয়। প্রথমে তারা অফিসে গেটের তালা ভেঙে বারান্দায় প্রবেশ করে। এরপর দরজা ভেঙে রুমে ঢুকে পড়ে। তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র, রড়, হকিস্টিক ও হাতুড়ি ছিল। এ সময় তারা দৈনিক সংগ্রামের খুলনা বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রাজ্জাক রানাকে খুঁজতে থাকে। তারা হকিস্টিক, হাতুড়ি, রড-লাঠি দিয়ে একে একে অফিসের আসবাবপত্র বুক সেলফে রক্ষিত সাংবাদিকতায় পাওয়া বিভিন্ন সংগঠনের দেয়া সম্মাননা ক্রেস্ট, শহীদ সাংবাদিক শেখ বেলাল উদ্দিনের ছবি, বিদ্যুতের মিটার ভাংচুর করে। হামলাকারীরা একটি কম্পিউটার, একটি টেলিভিশন, বুক সেল্ভ, ২২টি চেয়ার, ৪টি টেবিল, একটি ফাইল কেবিনেট ভাংচুরসহ অফিসে রক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, টেবিলের ড্রয়ারে থাকা নগদ কয়েক হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যায়। পত্রিকা অফিসের ভেতরে তারা ঘণ্টা খানেক ধরে তান্ডব চালায়। পুনরায় শ্লোগান দিতে দিতে চলে যাওয়ার সময় বাড়িওয়ালাকে দৈনিক সংগ্রাম অফিস বন্ধ করে সাইনবোর্ড খুলে ফেলার হুমকি দিয়ে যায়। মাসের মাঝামাঝি হওয়া সত্ত্বেও দৈনিক সংগ্রাম কর্তৃপক্ষ অফিস ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
দৈনিক সংগ্রামের অফিসের বাড়িওয়ালা মোস্তফা ফারুক আহমেদ বাপ্পী ওই সময় বলেছিলেন, হামলাকারীরা তাকে হুমকি দিয়ে বলে গেছে তিন ঘন্টার মধ্যে সংগ্রামের সাইন বোর্ড খুলে ফেলতে হবে। তা না হলে আপনার বিল্ডিংয়েরও ক্ষয়ক্ষতি হবে।
এ ব্যাপারে খুলনা সদর থানার ওসি আসলাম বাহার বুলবুল-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মামলা নেয়নি। এমনকি জিডি পর্যন্তও করতে দেয়নি। উপরন্তু খুলনা বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রাজ্জাক রানাকে একাধিকবার গ্রেফতারের জন্য বাসাবাড়িতে অভিযান চালায়। পরে অবশ্য খুলনা সদর থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও কয়েকজন সাংবাদিক নেতার চাপ ছিল দৈনিক সংগ্রামের খুলনা বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রাজ্জাক রানাকে গ্রেফতার করার। এ জন্য আমরা তার বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে একাধিকবার অভিযান চালিয়েছি। কয়েকবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় এনেছি। জিজ্ঞাসাবাদ করে কোন সুনিদিষ্ট অভিযোগ না থাকায় থানা থেকে ছেড়ে দিয়েছি।
এদিকে এমন একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা খুলনা প্রেসক্লাব সংলগ্ন পত্রিকা অফিসে ঘটলেও তৎকালীন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ কোন প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি। আবার অনেকেই এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। চব্বিশের ৩৬ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রেসক্লাবের একাধিক অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ বলেন, যারাই দৈনিক সংগ্রামের খুলনা অফিসের ফ্যাক্স, টেলিফোন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে নিউজ-ছবি তাদের অফিসে পাঠিয়েছেন তারাই আবার এমন হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে। যা চোখের সামনে দেখা আর অনুতপ্ত হওয়া ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
এ ব্যাপারে দৈনিক সংগ্রামের খুলনা বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রাজ্জাক রানা বলেন, অফিসে হামলার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। পুলিশ প্রায়শই আমাকে খোঁজ করতে থাকে। মোবাইল বদলে পালিয়ে থাকতাম। একদিন ভোরে পুলিশ আমাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদ করে তৎকালীন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন-বিএফইউজের সহ-সভাপতি মো. রাশিদুল ইসলাম ও নির্বাহী সদস্য এইচ এম আলাউদ্দিনের অনুরোধে থানা থেকে ছেড়ে দেন। এরপর আমি বাসা পরিবর্তন করে অন্যত্র চলে যাই। একজন সংবাদকর্মীর পক্ষে এভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে থাকা খুবই কষ্টকর। আমি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।