নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মিসাইল ও ড্রোন হামলার কারণে বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ খরচ সামাল দিতে কনটেইনার প্রতি নতুন করে ‘যুদ্ধঝুঁকি’ বা ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী পণ্য পরিবহন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

কনটেইনারে ৮০০ থেকে ২ হাজার ডলার সারচার্জ : শিপিং খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যগামী যেসব কনটেইনার বন্দর বা জাহাজে রয়েছে, সেগুলোর ওপর কনটেইনার প্রতি অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে। ১৪ টন ধারণক্ষমতার একটি একক কনটেইনারে ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। হিমায়িত পণ্যবাহী বড় ‘রেফার’ কনটেইনারে এই মাশুল দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বীমা কাভারেজের খরচ বেড়ে যাওয়া, নাবিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং জাহাজকে নিরাপদ রাখতে বিকল্প পথে চলার কারণে সময় ও খরচ বাড়া উল্লেখযোগ্য। এসব কারণেই বড় শিপিং লাইনগুলো সারচার্জ আরোপ করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এ সারচার্জ আরও বাড়তে পারে।

বড় শিপিং লাইনগুলোর ঘোষণা : বাংলাদেশে কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষ অবস্থানে থাকা কয়েকটি আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিও ইতোমধ্যে জরুরি সারচার্জ ঘোষণা করেছে।

ফ্রান্সভিত্তিক সিএমএ-সিজিএম গত ৩ মার্চ মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের ১৩ দেশে পণ্য পরিবহনে ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপের ঘোষণা দেয়।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি) আরব উপসাগরমুখী চালানে প্রতি কনটেইনারে ৮০০ ডলার সারচার্জ নির্ধারণ করেছে।

ডেনমার্কের মায়ের্সক লাইন উপসাগরীয় সাতটি দেশে পণ্য পরিবহনে প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৮০০ ডলার জরুরি ভাড়া ঘোষণা করেছে।

জার্মানির হ্যাপাগ-লয়েড প্রতি কনটেইনারে ১ হাজার ৫০০ ডলার যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপ করেছে।

শিপিং খাতের কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধের কারণে সমুদ্রে আটকে থাকা আরব উপসাগরমুখী অনেক জাহাজকে কাছাকাছি নিরাপদ বন্দরে খালাস করা হতে পারে। এতে অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় তা মেটাতেই এ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ, জাহাজ আটকা : যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এতে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১৪০টি জাহাজ আটকা পড়েছে বলে শিপিং খাতের সূত্রে জানা গেছে। এসব জাহাজে প্রায় তিন লাখ কনটেইনার পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপিং কোম্পানি এমএসসিরই রয়েছে ১৫টি জাহাজ, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টিইইউস কনটেইনার রয়েছে। এসব কনটেইনারের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নির্ধারিত পণ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।

শিপিং ব্যবসায়ীরা জানান, যুদ্ধঝুঁকির কারণে এসব জাহাজ কোনো বন্দরে ভিড়তে পারছে না এবং পণ্য খালাসও করা যাচ্ছে না। এতে জাহাজগুলো জ্বালানি খরচ করলেও কোনো দিকে অগ্রসর হতে পারছে না।

আমদানি কনটেইনারে ভাড়া বাড়ল : মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব এখন বৈশ্বিক সমুদ্রবাণিজ্যে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকায় পণ্যবাহী জাহাজগুলো কনটেইনার প্রতি ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন থেকে আমদানিকৃত ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে শিপিং লাইনগুলো জানিয়েছে।

তবে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) বলছে, বাস্তবে এই ভাড়া ৫০০ ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, আগে চীন থেকে চট্টগ্রামে ৪০ ফুট কনটেইনারের ভাড়া ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার। এখন তা বেড়ে ২ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। আমরা তা ১ হাজার ৮০০ ডলারে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছি।

পোশাক শিল্পে চাপ বাড়ার শঙ্কা : শিপিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং পোশাক শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জিবিএক্স লজিস্টিক লিমিটেডের হেড অব অপারেশন মুনতাসির রুবায়েত বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং তেলের দাম বাড়ছে। আবার নিরাপত্তার কারণে অনেক জাহাজ আফ্রিকার নিচ দিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ইউরোপে যেতে বাধ্য হতে পারে। এতে সময় ও খরচ উভয়ই বাড়বে।

বিজিএমইএর নেতারাও বলছেন, এতে পোশাক শিল্পের মুনাফার মার্জিন কমে আসবে। এমনিতেই আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন বাণিজ্যিক চাপ রয়েছে। তার ওপর জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া বাড়লে শিল্পটি নতুন করে সংকটে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নীতি সহায়তা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

রেমিট্যান্স নির্ভর বাজারে প্রভাব : মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী প্রবাসী কাজ করেন। তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্য যেমন গামছা, মুড়ি, বিস্কুট, সবজি, মাছ, সুপারি ইত্যাদি কনটেইনারে করে পাঠানো হয়। কিছু পণ্য আকাশপথেও রপ্তানি করা হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসব সরবরাহেও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে এবং প্রায় ৭৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। আমদানির বড় অংশ জ্বালানি, সার ও খনিজ কার্গো জাহাজে আনা হলেও শিল্পের কাঁচামালসহ অনেক পণ্য কনটেইনারে আসে। রপ্তানির মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি, ফলমূল, হিমায়িত মাছ, ক্যাপ ও জুতা।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। এশিয়ার বাজারে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথেই সরবরাহ করা হয়। ফলে এই নৌপথে অচলাবস্থা তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, জাহাজ চালাতে জ্বালানি অপরিহার্য। তাই তেলের দাম বাড়লে শিপিং কোম্পানিগুলোর ভাড়া বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়েই পড়বে।

চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব : বাংলাদেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে প্রায় ২৯ লাখ ৬১ হাজার ১১৮ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি ছিল ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ২৭০ টিইইউস এবং রপ্তানি ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৮৪৮ টিইইউস।

গত মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ১১৩টি জাহাজের মাধ্যমে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৯২ টিইইউস আমদানি পণ্য এবং ১ লাখ ৩ হাজার ৩৫ টিইইউস রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সমুদ্রবাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।