খুলনা ব্যুরো, মোংলা সংবাদদাতা : বাগেরহাটের রামপালে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪ জনের মধ্যে খুলনার কয়রা উপজেলার একই পরিবারের চার জনের জানাযা-দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে আব্দুস সালাম মোড়লের মেয়ে নববধু মার্জিয়া মিতু, তার ছোট বোন লামিয়া, তাদের দাদি মৃত শামছুদ্দিন মোড়লের স্ত্রী রাশিদা বেগমের বাড়ির পাশের মাঠে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদেরকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দাকোপে মিতুর নানী আনোয়ারা বেগমের জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। নিহত মিতু নাকশা আলিম মাদরাসায় আলিম প্রথম বর্ষে পড়ত।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ( ১১ মার্চ) রাতে নাকশা গ্রামের আব্দুস সালাম মোড়লের মেয়ে মিতুর বিয়ে হয় মোংলার আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে সাব্বির হোসেনের সাথে। বৃহস্পতিবার সকালে নববধু মিতু তার ছোট বোন লামিয়া, বৃদ্ধা দাদি রাশিদা ও নানি আনোয়ারা বেগমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি রামপাল বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে মোংলা থেকে আসা একটি বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসে থাকা নববধু, বর ও তাদের স্বজনসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়। এ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতদের গ্রাম নাকশাসহ আশপাশের এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। বাড়িতে স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বৃহস্পতিবার যে বাড়িটি ছিল বিয়ের আনন্দে আত্মহারা শুক্রবার সেই বাড়ির চারি পাশে শুধু কান্নার আওয়াজ। লাল শাড়ি আর মেহেদী রঙ্গা হাতে যাচ্ছিলেন শশুর বাড়ি। কনেকে বরণ করতেও প্রস্তুত ছিল শশুর বাড়ির লোকজন তার ঠিক কয়েক ঘন্টা আগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেছে ১৪ টি প্রাণ।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪ টায় নববধুসহ তিন জনের লাশ পৌঁছায় তাদের বাড়িতে। লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকে পাগল প্রায় মিতুর বাবা, মা ও স্বজনরা। কান্না, আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। শুক্রবার সকাল ১০ টায় উত্তর নাকশা গ্রামেই তাদের জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকজন সেখানে উপস্থিত হন। জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। জানাযার নামাযে ইমামতি করেন হাফেজ আবু বকর সিদ্দিক।

নাকশা ডি এফ আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আশরাফুল ইসলাম বলেন, নিহত নববধু মিতুু তার মাদরাসার আলিম শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তার সরলতা পুরো শিক্ষকদের মন জয় করে নিতে পারছিল। তাকে হারিয়ে শিক্ষকরাও শোকে মুহ্যমান।

আমাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জুয়েল বলেন, ইতোপুর্বে এমন ঘটনা তার ইউনিয়নে আর কখনও ঘটেনি। পুরো ইউনিয়নের মানুষ শোকে স্তব্ধ।

কয়রা থানার অফিসার ইনচার্জ তদন্ত মো. শাহ আলম বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে নাকশা গ্রামে পারিবারিক কবর স্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

ময়নাতদন্ত ছাড়াই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর : খুলনা-মোংলা মহাসড়কে বাসের সাথে বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত বর-কনেসহ ১০ জনের লাশ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) মর্গ থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। রামপাল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকা চারজনের লাশ সেখান থেকে হস্তান্তর করা হয়। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে খুমেক হাসপাতালের মর্গ থেকে লাশগুলো হস্তান্তর করা হয়। পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই শুধুমাত্র সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রশাসনও এতে সম্মতি দেয়। এর আগে, দুর্ঘটনাস্থল রামপাল থেকে আরও চারটি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বৃষ্টি ও বাস-মাইক্রোবাসের মাত্রাতিরিক্ত গতি : প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে হঠাৎ বিকট শব্দ হল। সাথে সাথেই প্রচুর ধোয়া উড়তে ছিল। বৃহস্পতিবার রাতে এভাবেই দুর্ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী সিয়াম শেখ। সিয়াম আরও বলেন, দুর্ঘটনার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। পাশে একজায়গায় আমি বসে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ টের পাই, সাথে প্রচুর ধোয়া। দু’টি যান বাহনেরই গতি অনেক বেশি ছিল এবং পুরো মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। বাসটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। পাশে থাকা কিছু টাইলস মিস্ত্রি দৌড়ে আসেন, আমিও তাদের সাথে দৌড়ে যাই। উদ্ধার কাজে অংশ নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও পরবর্তীতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। লাশ এবং আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।

বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাফর আহমেদ বলেন, মাইক্রোবাসটিতে চালকসহ ১৫জন ছিলেন। আহত আরও একজন মারা গেছেন। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় ১৪ জন মারা গেছেন। আর একজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।

কাটাখালী হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কে এম হাসানুজ্জামান বলেন, যাত্রীবাহী বাসটি খুলনার দিকে যাচ্ছিল। আর যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসটি ছিল মোংলা অভিমুখে। পথিমধ্যে বেলাইব্রিজ এলাকায় দু’টি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী টাইলস মিস্ত্রি শাহিন মোল্লা জানান, এত ভয়াবহ দুর্ঘটনা আগে দেখেনি। দুটো গাড়িই দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। কয়েকজন ঘটনাস্থলে মারা গেছে। আর যারা আহত ছিল, তাদের অবস্থাও খুবই গুরুত্বর।

নিহতদের প্রতিবেশী ও তাদের নিকট আত্মীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মোংলার শেলাবুনিয়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাক ছেলে বিয়ে দেওয়ার জন্য খুলনার কয়রা উপজেলার নকশায় যান। বিয়ে শেষে মাইক্রোবাসে করে মোংলার উদ্দেশে আসার সময়, বেলাই ব্রিজ এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে।

তছনছ হয়ে গেল সাজানো সংসার : সড়ক দুর্ঘটনায় একটি সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেল। তিন শিশু সন্তান নিয়ে মারা গেছেন জনির স্ত্রী পুতুল। যদিও দুর্ঘটনায় পুতুলের স্বামী জনি বেঁচে যায়।

গত বুধবার রাতে দেবর আহাদুর রহমান সাব্বিরের বিয়ে হয়। রাতে খুব আনন্দ উল্লাস হয়েছে কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামে। দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে নববধুসহ মাইক্রোবাসে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা হয় পরিবারটি। কিন্তু বাড়ি যাওয়ার আগেই রামপাল বেলাই ব্রিজের কাছে নৌবাহিনীর বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ওই দুর্ঘটনায় মোংলা বিএনপি নেতা আব্দুর রজ্জাকের পরিবারের ১২ জন সদস্য নিহত হয়।

রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে পুতুলের দেবর আলামিন কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ভাবি খুবই চঞ্চল ছিলেন। এক হাতে সংসারের সব কিছু ম্যানেজ করতেন। সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। ভাবির সাথে আজ তার তিন সন্তান চলে গেল। একটি সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেল। কত সুন্দর সংসার ছিল আমাদের।’ এখন আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম-বলেই তিনি অঝোরে কাঁদতে থাকেন।

‘আল্লাহ তুমি আমাকেও নিয়ে যাও’ : খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে কাঁদতে কাঁদতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সালাম মোড়ল। খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা গ্রামের সালামের মেয়ে মারজিয়া আক্তার মিতুর সাথে বিয়ে হয়েছিল মোংলার ৮নং ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা রাজ্জাকের ছেলে আহদুর রহমান সাব্বিরের সাথে। সড়ক দুর্ঘটনায় তার দুই মেয়ে মারজিয়া আক্তার মিতু, লামিয়া এবং তাদের দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মৃত্যু হয়। সবাইকে হারিয়ে সালাম মোড়ল পাগল প্রায়।

শোকে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরে আসলে বাগরুদ্ধ হয়ে এদিকে ওদিক পরিবারকে খুঁজছেন। এই শোকবহ পরিবেশের মধ্যে কথা হয় সালামের সাথে।

তিনি বলেন, ‘গত বুধবার রাত ১১টায় ঘটা করে মেয়ের বিয়ে দেই। সারারাত উৎসব চলে। আনন্দ-উৎসব করে র্নিঘুম রাত কাটায় প্রায় সবাই। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় মারজিয়ার সাথে ওর শ্বশুর বাড়ি আমার আরেক মেয়ে লামিয়া, আমার মা রাশিদা বেগম ও শাশুড়ি আনোয়ারা বেগম মাইক্রোবাসে রওয়ানা হয়। কিন্তু একি হলো, আমার আর কেউ রইলো না।’

সালাম মোড়ল আরও বলেন, ‘আজ বিকেলে বৃহস্পতিবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে মোবাইলে দুর্ঘটনার কথা জানানো হয়। খবর পেয়ে ছুটে আসি। রওয়ানা দেওয়ার সময় আমি কিছুই জানতে পারিনি। এসে দেখি সব শেষ। ‘আমার আর কেউ থাকলো না, আল্লাহ তুমি আমাকেও নিয়ে যাও।’

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজ এলাকায় বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে প্রাণ হারান দুই পরিবারের ১৩ জন এবং মাইক্রোবাসের চালক। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দুপুরে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার নকশা এলাকার মিতুর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সাব্বির। পরে নববধূকে নিয়ে মোংলার নিজে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় পুরো পরিবার। মোংলা উপজেলার বেলাইব্রিজ এলাকায় আসলেই দুর্ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার বিকেলে দুর্ঘটনার পরপরই একের পর এক লাশ আনা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

কাটাখালী হাইওয়ে থানার উপপুলিশ পরিদর্শক এসআই মো. হাসান জানান, নিহতদের সবাই মাইক্রোবাসের যাত্রী ছিল। মাইক্রোবাসে বর পরিবারের ১১, কনে পরিবারের ৩ জন ও ড্রাইভারসহ ১৫ জন যাত্রী ছিল। আর মৃতদের মধ্যে মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকসহ বর পরিবারের ৯ জন, কনে পরিবারের ৪ জন ও ড্রাইভারসহ ১৪ জন নিহত হন।

খুলনা অঞ্চল জামায়াতের গভীর শোক প্রকাশ

বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর খুলনা অঞ্চল নেতৃবৃন্দ।

বিবৃতিদাতারা হলেন-খুলনা অঞ্চল জামায়াতে ইসলামীর পরিচালক অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ এমপি, মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান খান এমপি, মাস্টার শফিকুল আলম ও হাফেজ রবিউল বাশার এমপি, খুলনা মহানগরী আমীর অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান ও সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন এমপি, খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন ও সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, বাগেরহাট জেলা আমীর মাওলানা রেজাউল করীম ও সেক্রেটারি শেখ মো. ইউনুস, সাতক্ষীরা জেলা আমীর উপাধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম মুকুল ও সেক্রেটারি মাওলানা আজিজুর রহমান।

বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের বাগেরহাটের রামপালের বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর গাড়ির সঙ্গে যাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নববধু ও শিশুসহ ১৪ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। এই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নারী, শিশু ও সাধারণ যাত্রীদের প্রাণহানির সংবাদ অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও হৃদয়বিদারক। হঠাৎ করে এভাবে এতগুলো তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলার কাছে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। নেতৃবৃন্দ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হয়।

মোংলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত একই পরিবারের ৯ জনের দাফন সম্পন্ন

মোংলা সংবাদদাতা : বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত একই পরিবারের ৯ জনকে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার জুমার নামাযের পর জানাযা শেষে মোংলা পৌর কবরস্থানে পাশাপাশি খোঁড়া নয়টি কবরে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়। পুরো এলাকাজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া।

নিহত আব্দুর রাজ্জাক ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য আগেই মোংলা পৌর কবরস্থানে পাশাপাশি নয়টি কবর প্রস্তুত করা হয়। শুক্রবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাযা শেষে লাশগুলো ওই কবরেই দাফন করা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফবাসের সঙ্গে যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মোট ১৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বর-কনেসহ দুই পরিবারের সদস্যরা ছিলেন।

পারিবারিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

জানাযা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে শোক জ্ঞাপন করেন বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম। এ সময় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে শোক জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বাগেরহাট জেলার নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল ওয়াদুদ। বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ। এছাড়া মোংলা ও আশপাশের এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ জানাযায় অংশ নেন। জানাযা শেষে পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ বিরাজ করে।

নিহত ১৪ জনের মধ্যে বর, তার বাবা, ভাই-বোন, ভাবি এবং ভাগ্নে-ভাগিনাসহ একই পরিবারের ৯ জন ছিলেন। শুক্রবার ভোররাতে তাদের লাশ বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার শেহালাবুনিয়া এলাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে কনে, তার বোন, দাদি ও নানির লাশ নিয়ে যাওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়। সেখানে শুক্রবার জুমার আগে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার রাতে আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার (মিতু)-র সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বিরের। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১২টার দিকে কয়রা থেকে নবদম্পতি ও স্বজনরা মোংলায় বরের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।

বর-কনেসহ দুই পরিবারের মোট ১৪ জন একটি মাইক্রোবাসে যাত্রা করছিলেন। তারা রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জনের মৃত্যু ঘটে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং তাদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম। এছাড়া নিহতদের মধ্যে ছিলেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম, নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাসের চালক নাঈম।

নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার জানান, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মোংলায় বসবাস করলেও গ্রামের বাড়ি কয়রায়। তিনি বলেন, “রাজ্জাক ভাই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন কয়রায়। পরে ছেলের বিয়েও দিলেন। কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটি শেষ হয়ে গেল।”

তিনি আরও জানান, মোংলার আশপাশের নয়টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছিল। গোসলের পর একে একে নয়জন স্বজনের লাশ খাটিয়ায় তোলা হয়। পরে শুক্রবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাযা শেষে তাদের মোংলা পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।