আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতকরণের জন্য খুলনার ৬টি আসনে ১৫ জন এক্সিকিউটিভ (নির্বাহী) ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদিকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ১৬ মাসে মহানগরীতে ৪৮ এবং জেলায় আরও ৪৭ মোট ৯৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। সন্ধ্যা নামলেই নগরীতে নেমে আসে চরম আতঙ্ক। পুলিশের তথ্য বলছে, সক্রিয় অন্তত ছয়টি সন্ত্রাসী বাহিনী এসব হত্যাকান্ডর সঙ্গে জড়িত।
শুক্রবার খুলনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আ স ম জামশেদ খোন্দকার স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর আওতায় নির্বাচনী আচরণ বিধি প্রতিপালন ৬টি নির্বাচনী এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ১৫ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের ১২ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়োগ করা হলো।
খুলনা মহানগরীর দুটি আসনের মধ্যে নগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সহকারী কমিশনার নাজমুস সাকিব এবং সহকারী কমিশনার শেখ রায়হানা ইসলামকে, নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড পর্যন্ত সহকারী কমিশনার ইমরান হাসান এবং সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) অপ্রতিম কুমার চক্রর্বত্তীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া খুলনার জেলার চারটি আসনের মধ্যে রূপসায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম, দিঘলিয়ায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেবাংশু বিশ্বাস, বটিয়াঘাটায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শোয়েব শাত-ঈল-ইভান, তেরখাদায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আঁখি শেখ, ডুমুরিয়ায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অমিত কুমার বিশ্বাস, ফুলতলায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌহিদ রেজা, দাকোপে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সেবগাতুল্যাহ, পাইকগাছায় উপজেলা মো. ফজলে রাব্বী ও কয়রায় উপজেলা সহকারী কমিশনার দীপেন সাধক রনিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আদেশে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসাররা তাদের সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রে সমন্বয় করবেন এবং খুলনা মহানগর এলাকায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সমন্বয় করবেন।
খুলনাকে নিরাপদ করতে কঠিন চ্যালেঞ্জ : আইনশৃখলা পরিস্থিতির অবনতিতে সমালোচনা নিয়ে বিদায় নিয়েছেন কেএমপি কমিশনার মো. জুলফিকার আলি হায়দার। নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান। সদ্য যোগদান করেছেন জেলা প্রশাসক আ স ম জামসেদ খোন্দকার এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান। ফেব্রুয়ারীর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। শীর্ষ এ দু’কর্মকর্তা গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময়কালে খুলনা থেকে চরমপন্থী উৎখাতে জোর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিজেদের শতভাগ সৎ দাবি করে অবৈধভাবে দখল করা জলকর দখলমুক্ত করা, ইটভাটা উচ্ছেদসহ সকল প্রকার আর্থিক অনৈতিক লেনদেন শক্ত হাতে দমনের আশ্বাস দেন।
খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে খুলনা জেলায় ৪৭টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় চারজন, কুপিয়ে ও গুলি করে ২৬ জন, অজ্ঞাত কারণে ১১ জন, শ্বাসরোধ করে ২ জন এবং বাকি পরকীয়ার কারণে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য বলছে, গত ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে খুলনা শহরে ৪৮টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলাও হয়েছে, যা ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী ১ বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এসব হত্যা মামলায় দেড়শতাধিক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ১৬ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এসব আসামির কাছ থেকে রাইফেল দুটি, বিদেশি রিভলভার পাঁচটি, বিদেশি পিস্তল ১৭টি, দেশি পিস্তল একটি, বন্ধুক ১টি, দুটি কাটারাইফেল, পাঁচটি পাইপগান, তিনটি শাটারগান উদ্ধার করা হয়েছে।
গত পাঁচ মাসে মহেশ্বরপাশা এলাকায় ঘটে চারটি খুন। ১১ জুলাই যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান মোল্লা খুন, ৩ আগস্ট ঘের ব্যবসায়ী আলামিন হাওলাদার খুন, ১ অক্টোবর তানভীর হাসান শুভ খুন ও ২ নভেম্বর ভুলবশত গুলিতে এমদাদুল হক নিহত হয়।
৩০ নভেম্বর মহানগর ও দায়রা জজ আদালতের সামনে দিন-দুপুরে গুলি ও কুপিয়ে খুন করা হয় দুই যুবক হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজনকে। এর ১৪ দিন আগে করিমনগরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে খুন করা হয় আলাউদ্দিন মৃধাকে। একই দিন লবণচরায় দুই শিশু ও তাদের নানীকে ভাড়াটে খুনির হাতে প্রাণ হারাতে হয় জমি বিরোধের জেরে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলের নদ-নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৫০ লাশ। এসবের অনেকগুলোর পরিচয় আজও অজানা। আইন-শৃখলার চরম অবনতি মাথায় নিয়ে সকল দপ্তরে নতুন কর্মকর্তারা যোগদান করেছেন। গত মঙ্গলবার একই দিন দুপুরে সদ্য যোগদানকৃত জেলা প্রশাসক আ স ম জামসেদ খোন্দকার এবং বিকেলে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন। দু’কর্মকর্তাই নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
খুলনা জেলা প্রশাসক আ স ম জামসেদ খোন্দকার বলেন, আন্ডারগ্রাউন্ডের সন্ত্রাসীদের শক্ত হাতে দমন করা হবে। দুর্নীতি রোধে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান বলেন, কোন শক্তি নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারবে না। অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী দমনে পুলিশের নানা কৌশল ব্যবহার করা হবে। খুলনাকে শান্ত নগরীতে পরিণত করতে সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রশাসনের নতুন কর্মকর্তারা খুলনাকে নিরাপদ করতে যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তাতে সফল হবেন, এমন প্রত্যাশা নগরবাসীর।