অবশেষে বেহাল সড়ক মেরামত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের শিকার মানুষের কষ্ট কমে আসবে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলছেন, দেশের বেশিরভাগ সড়কেরই বেহাল দশা। মহাসড়ক যেমন তেমন আঞ্চলিক সড়ক জেলা সড়ক, এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের সড়কগুলো বেশিরভাগই চলাচলের অনুপোযোগী। খারাপ রাস্তায় মানুষের ভোগান্তির কারণে দুঃখও প্রকাশ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ।
সড়ক ও জনপথ অধিপÍর সূত্রে জানা গেছে, বর্ষায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেড় হাজার কিলোমিটার সড়কের সংস্কার কাজ আগামী সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
সারা দেশে এই মুহূর্তে কী পরিমাণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত জানতে চাইলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান জানান, তার আওতাধীন দেড় হাজার কিলোমিটার রাস্তা খারাপ।
সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, দেড় হাজার কিলোমিটারের মধ্যে আমরা সড়ক মেরামতের ক্ষেত্রে প্রায়োরিটাইজ করব (্অগ্রাধিকার দেব)। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আমরা আরেকটি মিটিং করব। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আমরা এসব (সড়ক সংস্কার) কাজ কমপ্লিট করব।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বর্ষা শেষ হলে রাস্তা সংস্কার শুরু হবে। এ জন্য আগে থেকেই বৈঠক শুরু হয়েছে। যেসব রাস্তা পানি কিংবা বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেগুলো সংস্কারের সময় কংক্রিট দিয়ে করা হবে। প্রথমে অগ্রাধিকার পাবে জাতীয় মহাসড়ক। এরপর আঞ্চলিক মহাসড়ক।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়া বলেন, এলজিইডির অধীনে মোট ৪ লাখ ১১ হাজার কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এরমধ্যে এক লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার পাকা। প্রতিবছর আমরা সড়ক মেরামতের জন্য তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা পাই, এবারও সেটা পেয়েছি। তবে কি পরিমাণ সড়ক বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।
উপদেষ্টা বলেন, গাড়ি আমদানি এক দেশ-নির্ভর হওয়ায় গুণগত মান বাড়ছে না। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আমদানির নীতি পরিবর্তন করা দরকার। সড়ক নির্মাণের খরচ কমানোর উপায় বের করতে একটি ‘রিভিউ কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়) শেখ মইনউদ্দিনকে কমিটির প্রধান করা হচ্ছে। কমিটিতে সড়ক পরিবহন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের রাখা হবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কমিটি গঠন করা হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেট শিডিউল ও সড়কের প্রাক্কলিত ব্যয় রিভিউ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ খরচ ৩০ শতাংশ বেশি। কমিটি বিস্তারিত অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে। গুণগত মান অক্ষুন্ন রেখে সড়ক নির্মাণে সচেষ্ট থাকবে সরকার।
উপদেষ্টা বলেন, দেশে যেসব সড়কে পণ্যবাহী যান ও মানুষ চলাচল বেশি করে, সেগুলো সংস্কারে অগ্রাধিকার পাবে। এমনভাবে সড়ক সংস্কার করতে হবে, যেন তা স্থায়ী হয়।
রাজধানীর একটি সড়কের বেহাল চিত্র : দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় রাজধানীর জুরাইন-দয়াগঞ্জ সড়কটি বেহাল হয়ে পড়েছে। সড়কের গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনের সামনের অংশে অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। এসব খানাখন্দ কোথাও কোথাও এক থেকে দেড় ফুট পর্যন্ত গভীর। বৃষ্টির পানি জমে সেসব গর্ত পুকুরের রূপ ধারণ করেছে। এতে চলাচলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে বিভিন্ন যানের চালক, যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের। প্রায় প্রতিদিনই যানবাহন উল্টে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বেহাল সড়কে চলতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে ঢাকায় ঢোকার পর জুরাইন থেকে স্বল্প সময়ে গুলিস্তান ও মতিঝিল যাওয়ার সহজ পথ জুরাইন-দয়াগঞ্জ সড়ক। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে অসংখ্য যানবাহন। কিন্তু সড়কটিতে অসংখ্য খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে বৃষ্টিতে এই ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ধীরগতিতে যানবাহন চলায় সৃষ্টি হয় যানজটের।
সরেজমিনে দেখা যায়, জুরাইন-দয়াগঞ্জ সড়কের গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন এলাকায় রাস্তার অনেকাংশ ভেঙেচুরে গেছে। সড়কের একটু পরপর বড় বড় গর্ত। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় দেখে বোঝার উপায় নেই গর্তগুলো কতটা গভীর। ফলে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে প্যাডেলচালিত রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভ্যানসহ অন্য পরিবহনগুলোকে। আর ঝুঁকি নিয়ে চলতে গিয়ে যানবাহন উল্টে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
রাস্তার পাশের চা-দোকানি আরাফাত জানান, প্রতিদিনই দু-চারটি রিকশাসহ ছোট যানবাহন উল্টে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। ফলে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ ও শিশুরা আহত হয়। পথচারী আজাদ বলেন, রাস্তাটি এতই বেহাল যে, বড় গাড়িই উল্টে যেতে চায়। অন্যদিকে হেঁটে চলাও একেবারেই অসম্ভব।
কথা হলে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, তিন বছর ধরে রাস্তার এ করুণ অবস্থা। প্রতিদিনই চোখের সামনে দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সড়কটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের।
লেগুনাচালক মামুন বলেন, প্রতিদিন অনেকবার এই রাস্তা দিয়ে চরম ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। আর বৃষ্টি হলে এই ঝুঁকি বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তখন গাড়ি চালাতে পারি না। রাস্তাটি দ্রুত সংস্কার না করলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
এদিকে, জুরাইন-দয়াগঞ্জ সড়কটি দ্রুত সময়ের মধ্যে সংস্কার করে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ‘জুরাইন-শ্যামপুর-কদমতলী ছাত্র-জনতা ঐক্য’এই ব্যানারে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মীরা অংশ নেন।