বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যার প্রধান কার্যালয় গাজীপুরে অবস্থিত। সারাদেশব্যাপী নিজস্ব ১২টি আঞ্চলিক ও ৮০টি উপআঞ্চলিক কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের ভেতরে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি স্টাডি সেন্টারে এবং দেশের বাইরে কোরিয়া, ইতালি, কাতার, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান-এই সাতটি দেশে বাউবির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় বাউবির ক্যাম্পাস শুধু গাজীপুরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পরিধি বিস্তৃত পুরো বাংলাদেশ ও প্রবাসী অধ্যুষিত নানা দেশে।

এদেশে উচ্চশিক্ষা ও ধারাবাহিক শিক্ষার সুযোগ এখনও সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হয়নি। ভৌগোলিক দূরত্ব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা অকালে ঝরে পড়ার মতো নানা বাস্তবতায় অসংখ্য মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূলধারা থেকে ছিটকে পড়েন। এই প্রেক্ষাপটে ‘শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগ’ ধারণাটি কেবল মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। সেই দ্বিতীয় সুযোগের আলোকবর্তিকা হয়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাউবি।

প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে দূরশিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে বাউবি শহর, গ্রাম ও প্রান্তিক জনপদে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছে। কর্মজীবী মানুষ, গৃহিণী, প্রবাসফেরত শ্রমিক, এমনকি একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া তরুণ-তরুণীরাও নতুন করে শিক্ষাজীবনে ফেরার সুযোগ পাচ্ছেন। নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা ছাড়াই স্বশিক্ষা উপকরণ, টিউটোরিয়াল ক্লাস, অডিও-ভিডিও সাপোর্ট, আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক কেন্দ্রভিত্তিক সহায়তা এবং পরীক্ষার কাঠামোর সমন্বয়ে বাউবি গড়ে তুলেছে একটি নমনীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী অল্প বয়সেই উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হন। ফলে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েই পড়াশোনা থেমে যায়। বাউবির এসএসসি ও এইচএসসি প্রোগ্রাম তাদের জন্য পুনরায় শিক্ষায় ফেরার কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের বিভিন্ন প্রোগ্রাম কর্মজীবীদের দক্ষতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তিগত আয়ের সম্ভাবনা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি জাতীয় উৎপাদনশীলতাও শক্তিশালী হচ্ছে।

শুধু সুযোগ সৃষ্টি নয়, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতের ক্ষেত্রেও বাউবি গুরুত্ব দিচ্ছে। পাঠক্রম প্রণয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও একাডেমিক তত্ত্বাবধান ক্রমেই আধুনিকায়িত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণ শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করছে। বিশেষ করে কোভিডকালীন অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার বাউবির দূরশিক্ষা মডেলকে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছেও আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।

তবে শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বাউবির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত টিউটরের অভাব, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা শিক্ষার মান ও সমতা নিশ্চিতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী এখনও ডিজিটাল ডিভাইসের অভাবে অনলাইন সেবা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছেন না। ফলে শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ ধরে রাখতে নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা অপরিহার্য। বাউবির গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা, আন্তর্জাতিক মানের ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও উপআঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি সহায়তা তহবিল গঠন করা গেলে বাউবি আরও কার্যকর ও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারবে। পাশাপাশি শিল্পখাত ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে পাঠক্রমের সংযোগ বাড়ালে সনদধারীদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও আরও উজ্জ্বল হবে।

শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের পথ নয়; এটি সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার। যে মানুষ একসময় আর্থিক সংকটে পড়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তিনিই যদি বাউবির মাধ্যমে আবার শিক্ষায় ফিরে এসে শিক্ষক, প্রশাসক কিংবা উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন—তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, রাষ্ট্রেরও সাফল্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাউবি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি দ্বিতীয় সুযোগের দর্শন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রতীক।

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আজীবন শিক্ষার ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ধারাবাহিকতায় বাউবি প্রমাণ করেছে-শিক্ষা কখনো থেমে থাকে না, সুযোগ পেলে মানুষ আবারও এগিয়ে যায়। শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগের এই আলোকবর্তিকা আরও উজ্জ্বল হোক-এটাই সময়ের দাবি।