গত দুইদিনে তিনটি ঘটনায় চরম আতংকিত হয়ে পড়েছে খুলনাবাসী। এর মধ্যে একটি ছিনতাই এবং অন্য দু’টি চাঁদাবাজির ঘটনা বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা যায়। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে রোববার দুপুরে নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকায়। সেখানের আশ্রয় ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি সংস্থার অফিসে ভাংচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। চাঁদার দাবিতে অফিসের সাইনবোর্ড ও আসবাবপত্র ভাংচুর হয় বলে অভিযোগ করেন, সংস্থার নির্বাচনী পরিচালক মমতাজ খাতুন। খবর পেয়ে খুলনা সদর থানা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এর আগেরদিন শনিবার দুপুরে নগরীর ময়লাপোতা সংলগ্ন সন্ধ্যা বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদার দাবিতে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ওই বাজারের ব্যবসায়ী আশা এ ব্যাপারে কেএমপির খুলনা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। শনিবার দুপুর আনুমানিক দুইটার দিকে একরাম নামের এক ব্যক্তি দোকনে গিয়ে তার কাছে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন।
চাঁদা না দিলে রাস্তায় গুলি করে লাশ ফেলা হবে বুলেও হুমকি দেওয়া হয়। এতে ওই বাজারের ২২২ জন ব্যবসায়ী আতংকে রয়েছেন। এছাড়া শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর বাগমারা ব্যাংকার্স গলির সামনে হাওড়া ব্রিজের ওপর সালাম গাজী (৩৬) নামে এক যুবককে কুপিয়ে ভুক্তভোগী সালাম গাজী নগরীর লবণচরা থানাধীন রিয়া বাজার জখম করে নগদ ৩০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহীম গাজীর ছেলে। হামলাকারীরা তার ডান হাতে দুটি কোপ দিয়ে সঙ্গে থাকা ৩০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, সান্ধ্য বাজারের এক ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্য ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা চাঁদাবাজদের থেকে রক্ষাসহ নগরীবাসীর সার্বিক নিরাপত্তা দিতে আইন-শৃংখলা বাহিনী ব্যর্থ হলে এর দায়ভার সরকারের ওপর বর্তায়। সুতরাং সার্বিকভাবে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্টদের আরও তৎপর হওয়া উচিত।
খুলনায় এক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় সদর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন মাছ ব্যবসায়ী আশা শেখ। পুলিশ অভিযোগের তদন্ত শুরু করলেও নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ব্যবসায়ী খুলনার বাইরে অবস্থান করছেন। গত শনিবার দুপুরে নগরীর সান্ধ্য বাজারে কয়েকজন সন্ত্রাসী আল্লাহর দান নামে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক আশা শেখের কাছে এ টাকা দাবি করে। খুলনা সদর থানায় লিখিত অভিযোগে ওই ব্যবসায়ী উল্লেখ করেন, শনিবার দুপুর ২ টা ১০ মিনিটের দিকে একরামসহ অজ্ঞাত পরিচয়ে আরও কয়েকজন সন্ত্রাসী দলবল নিয়ে ময়লাপোতা কেসিসি সান্ধ্য বাজারে এসে মাছ ব্যবসায়ী আশা শেখের নাম উল্লেখ করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাদের দাবিকৃত চাঁদা না দিয়ে দোকান খুললে তাকে রাস্তায় গুলি করে লাশ ফেলে রাখা হবে বলে হুমকি দেয়। এ ঘটনার পর থেকে ওই বাজারের ২২২ জন ব্যবসায়ী আতঙ্কে রয়েছেন। এ ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে ওই মাছ ব্যবসায়ী পারিবার-পরিজন নিয়ে খুলনার বাইরে অবস্থান করছেন। রোববার সকালে তারা খুলনা ছেড়ে যান। মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে মাছ ব্যবসায়ী আশা শেখ এ প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনার সময়ে তিনি বাজারে ছিলেন না। বাজারের সভাপতি ও অন্যান্যদের সামনে আশা শেখের নাম উল্লেখ করে সন্ত্রাসীরা তাকে খুঁজতে থাকে। মাছের দোকানটি বন্ধ রাখার নির্দেশও দিয়ে যায় তারা। তিনি বলেন, আমার প্রশ্ন তারা আমার ব্যাবসা বন্ধ করতে বলার কে?
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, আমার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছে সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসী একরামকেও তিনি চেনেন না। ওই বাজারে ব্যাবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণেও ঘটনাটি ঘটাতে পারে। তিনি আরও জানান, বিভিন্নস্থানে পাইকারি হিসেবে মাছ সরবরাহ করেন। তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বরিশালে অবস্থান করছেন। বাজার ব্যবসায়ীদের নিয়ে ঘটনার মীমাংসার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটার সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপত্তায় থাকতে হচ্ছে। পরবর্তীতে বিষয়টি আপনাদের জানানো হবে।
খুলনা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. কবির হোসেন বলেন, চাঁদা দাবির ঘটনায় সান্ধ্য বাজার ব্যবসায়ী আশা শেখ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সিসি টিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, অভিযোগটি এসআই ইব্রাহীম তালুকদারকে তদন্তের জন্য দেওয়া হয়েছে। দোষীদের চিহ্নিত পূর্বক গ্রেপ্তার করা হবে।
এদিকে মাছ ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, সন্ত্রাসী এবং চাঁদাবাজদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তিনি বলেন, সান্ধ্য বাজারে চাঁদা দাবির বিষয়টি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি ধারাবাহিক ঘটনা। এ ঘটনা পুলিশের দায় নিতে হবে। চাঁদাবাজ যদি কোন দলের হয় তাহলে সে দলকেও এ দায় নিতে হবে। সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজ ও চাঁদাবাজ নির্মূলে তিনি নতুন সরকার প্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
অপরদিকে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নানাভাবে, নানা কৌশলে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক সময় তাদের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন খেটে খাওয়া অসহায় মানুষও। রোববার দুপুরে দৌলতপুর থানাধীন রেলিগেট পোড়াবস্তি সংলগ্ন মহিলা মুদি দোকানি ডলি বেগমের নিকট সেনা সদস্য পরিচয় দিয়ে রেশনের সয়াবিন তেল বিক্রির কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে দুই হাজার ২০০ টাকা হাতিয়ে নেয়।
জানা গেছে, মধ্যবয়সি ওই প্রতারকের মুখে দাড়ি ছিল। নিজের কাছে রেশনের অনেক সয়াবিন তেল রয়েছে। কম দামে বিক্রি করবে এই বলে ডলি বেগমের কাছে থেকে টাকা নেয়। এ সময় ডলি বেগম তার পরিচিত ইজিবাইক চালক সোহেলকে দুইশ’ টাকা ভাড়া দিয়ে প্রতারকের সাথে তেল আনতে পাঠায়। খালিশপুর নতুন রাস্তায় এক দোকান দেখিয়ে প্রতারক ইজিবাইক চালককে বলে, এটা আমার দোকান, পিছনে গোডাউন থেকে তেল নিয়ে আসছি এই বলে ইজিবাইক চালককে বসিয়ে রেখে প্রতারক লাপাত্তা হয়। টানা দুই ঘণ্টার অধিক সময় বসে থাকার পর অধৈর্য হয়ে ইজিবাইক চালক দোকানি ডলি বেগমকে ফোন করে ঘটনা জানায়। ইতোমধ্যে ডলি বেগম বুঝে গেছে সে প্রতারিত হয়েছে।