চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদহ বাজারে নির্বাচন পরবর্তী ঘটনার রেশ ধরে গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিএনপির হামলায় জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমান নিহত ও ৬ জন গুরুতর আহত হয়েছে। এদের মধ্যে জীবননগর উপজেলার সুটিয়া গ্রামের ওয়াহেদ মিয়ার ছেলে বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মফিজুর রহমান (৪৫) ও তার ভাই হাফিজুর রহমানের (২৫) অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদেরকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখান থেকে তাদের ঢাকায় নেয়া হলে শনিবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে সেখানে হাফিজুর রহমান মারা যান। সংঘর্ষে অন্যান্য আহতরা হলেন, জামায়াত কর্মী খায়রুল ইসলাম (৫৫) ও মাহফুজ (২৮), হাসাদহ ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের অহ্বায়ক মেহেদী হাসান (৩৫) ও তার বাবা জসীম উদ্দীন(৬৫)। আহতদের উদ্ধার করে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত হাফিজুর রহমান (৪৫) জীবননগরের ‘ঢাকা জুয়েলার্স’-এর মালিক ও পরিচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন।
জানাগেছে- গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পূর্ব শত্রুতার জের ধরে উপজেলার হাসাদাহ বাজারের স্বেচ্ছাসেবকদলের নেতা মেহেদী হাসান পার্শ্ববর্তী সুটিয়া গ্রামে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে যান। বিষয়টি স্থানীয়রা টের পেয়ে তাকে সুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে আটকে রেখে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ নিয়ে যায়। শনিবার সকালে সুটিয়া গ্রামের খাইরুল হাসাদাহবাজারে বাজার করতে গেলে মেহেদী হাসানসহ তার দলবল খাইরুলকে মারধর করে। পরে খাইরুলসহ জামায়াত নেতারা বিষয়টি সমাধানের জন্য গেলে কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে সংঘর্ষের রূপ নেয়। ইফতারের পর সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত হাসাদাহ কামিল মাদরাসা গেটের সামনে দফায় দফায় এ সংঘর্ষ হয়। এ সময় ইউনিয়ন আমীর মাওলানা মফিজুর রহমান আক্রান্ত হলে তাকে উদ্ধার করতে বড় ভাই হাফিজুর রহমান এগিয়ে গেলে বিএনপি সমর্থকরা তাকেও দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের উদ্ধার করে জীবননগর হাসপাতালে পাঠায়। অবস্থার অবনতি হলে হাফিজুর ও মফিজুরকে প্রথমে যশোর জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়া হয়। রাতেই ঢাকার কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আড়াইটার দিকে মারা যান হাফিজুর রহমান।
সংঘর্ষে গুরুতর আহত তার ছোট ভাই ও বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মফিজুর রহমানকে ঢাকার কাকরাইলে অরোরা স্পেশালাইজড্ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। জামায়াতের আরও তিন কর্মী আহত হয়ে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষের আহতদের মধ্যে রয়েছেন- বাঁকা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম মাস্টার, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া নেতা মেহেদী হাসান ও তার বাবা জসীম উদ্দিন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের আমীর ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন এ ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড দাবি করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দাবি করেছেন।
জীবননগর থানার ওসি সোলাইমান শেখ বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত আব্দুস সালাম ও জসিম উদ্দীন নামের ২জনকে আটক করা হয়েছে, বাকীদের আটকের চেষ্টা চলছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে গতকাল রবিবার দুপুরে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে নিহত জামায়াত কর্মী হাফিজুর রহমানের ময়নাতদন্ত শেষে জেলা জামায়াতের নেতৃবৃন্দ গাড়িবহর নিয়ে নিজ গ্রাম সুটিয়ায় নিয়ে আসেন। এসময় তার ছোট ছোট ৩ সন্তানের আর্তচিৎকার আর স্ত্রী মূর্ছা যাবার দৃশ্যে উপস্থিত হাজারো নারী-পুরূষ ঢুকরে কেঁদে ওঠে ও হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারনা হয়। বাড়িতে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সুটিয়া ঈদগাহ ময়দানে বিকাল ৪ টায় নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন জেলা জামায়াতের আমীর ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ রুহুল আমিন। জানাযার পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন জেলা আমীর ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল, নিহতের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন, জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা আজিজুর রহমান, জেলা সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ. সাবেক জেলা আমীর আনোয়ারুল হক মালিক, খেলাফত মজলিসের ইপজেলা সেক্রেটারি জুনাইদ হোসেন, আলমডাঙ্গা উপজেলা আমীর, শফিউল আলম বকুল, জীবননগর উপজেলা আমীর মাওলানা সাজেদুর রহমান প্রমুখ। পরে আমীরে জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হিসেবে যোগদেন কেন্দ্রীয় কর্ম পরিষদ সদস্য ও জাতীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। পরে তাকে নিজ গ্রামে সুটিয়া কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
এর আগে বেলা ১১ টায় এই ঘটনার প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামের জীবননগর কার্যালয় থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বাসস্ট্যান্ড ট্রাফিক আইল্যান্ডে প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা নিহত হাফিজুর রহমানের হত্যাকাণ্ডে জড়িত বিএনপি কর্মীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়া দেয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার না হলে জীবননগর অচল করে দেবার হুসিয়ারী দেয়া হয়। বিক্ষোভ চলাকালে বিক্ষুব্ধ জনতা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানান এবং প্রায় ৩০ মিনিট শহরের যান চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় জীবননগর উপজেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা সাজেদুর রহমান, জেলা প্রশিক্ষণ স¤পাদক জিয়াউল হক, জেলা মাজলিসুল মুফাসসিরিন পরিষদের সভাপতি মাওলানা হাফিজুর রহমান, জীবননগর উপজেলা জামাতের নায়েবে আমীর সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। তাছাড়াও জানাযা পূর্ব সমাবেশে জেলা আমীর ও সংসদ সদস্য রুহুল আমিন- আজ সোমবার জেলাব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও আগামীকাল মঙ্গলবার দোয়া দিবস ঘোষনা করেন। তিনি আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে দোষীদের গ্রেফতারে প্রসাশন ব্যার্থ হলে জামায়াত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে বলে হুসিয়ারী দেন।
এদিকে জীবননগর উপজেলার সুটিয়া গ্রামে বিএনপির হামলায় আহত জামায়াত নেতাকে দেখতে রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা কাকরাইলের অরোরা হাসপাতালে যান আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকার পল্টন থানা আমীরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তারা হাসপাতালে গিয়ে তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন এবং দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করেন। সেখানে ডা. শফিকুর রহমান রোগীর খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের শান্তনা দেন। এ সময় নেতৃবৃন্দ্ব এ ধরনের ন্যক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। পাশাপাশি নিহত মোঃ হাফিজুর রহমানের রুহের মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
কুষ্টিয়ায় দুই গ্রুপের সংঘর্ঘ জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর
কুষ্টিয়া সংবাদদাতা : নির্বাচনী প্রতিহিংসায় কুষ্টিয়া সদর উপজেলার বড়িয়া ভাদালিয়াপাড়ায় সামাজিক বিরোধের জেরে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। এ সময় জামায়াতের নেতাকর্মীদের অন্তত ২০টি বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। শনিবার দিবাগত রাত ৮টার দিকে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হলে রাত ১০টার দিকে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে বেশ কিছু ধারাল দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বেশ কিছুদিন ধরে বটতৈল ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার বিএনপির ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুল হান্নান গ্রুপের সঙ্গে একই ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার (ইউপি সদস্য) সাইফুলের লোকজনের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল।
এর জের ধরে শনিবার রাতে বড়িয়া ভাদাদিয়াপাড়া এলাকায় দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এর এক পর্যায়ে দুই গ্রুপ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এতে উভয় গ্রুপের অন্তত পাঁচজন আহত হন। এ সময় ২০ টির অধিক বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে আহতদের উদ্ধার করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা জানায়, নির্বাচন পরবর্তী বিএনপির ইউনিয়ন সভাপতি শাহজাহান আলী হান্নান শেখের লোকজন জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালায়। রক্তাক্ত জখম করে বেশ কয়েকজনকে। এতে বিএনপি ও যুবদলের ক্যাডাররা সশস্ত্র হামলা চালায়।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, বটতৈল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বরিয়ার হান্নান মেম্বার ও ভাদালিয়া পাড়ার সাইফুল মেম্বারের মধ্যে সামাজিক দ্বন্দ্ব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই এলাকায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এর জেরে এই সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া এবং বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও জানান, অভিযানে একটি দেশীয় হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়েছে। এলাকা পুরুষ শূন্য হলেও তারা বিভিন্ন মাঠে ও ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে আছে বলে ধারণা করছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, নির্বাচনের আগে জামায়াতের সদর আসনের প্রার্থী মুফতি আমীর হামজা বরিয়া মসজিদে আসর নামাজ বাদ মুসল্লীদের উদ্ধেশ্যে কিছু হেদায়েতী কথা বলছিলেন। এ সময় বিএনপির ইউনিয়ন সভাপতি শাহজাহান আলী হান্নান লাফ দিয়ে উঠে বলতে থাকেন, মসজিদে কোন রাজনৈতিক আলোচনা হবেনা। এ সময় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মাঝে চরম বিশৃংখলা বেঁধে যায়। ওই ঘটনার জেরে বেশ কিছুদিন সেখানে চরম দ্বন্দ্ব সংঘাত চলতে থাকে। পরে জামায়াতের নেতৃবৃন্দ প্রশাসনের সহযোগিতায় সেই সমস্যার সমাধান করেন। সে সময়ই বিএনপি নেতাকর্মীরা বলেন নির্বাচন বেরিয়ে যাক তারপরে দেখা হবে। ওই ঘটনার জের ধরেই এখন পর্যন্ত সেখানে দ্বন্দ্ব সংঘাত চলছে। জামায়াতের নেতাকর্মীরা অত্যন্ত নিরাপত্তাহীনতায় সময় পার করছেন। প্রশাসন কঠোর ভূমিকা পালন না করলে যে কোন মুহর্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আশংকা করছে এলাকাবাসী।