যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবনে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পুড়ে গেছে দুইশ’ বছরেরও বেশি পুরনো ব্রিটিশ আমলের অমূল্য দলিলপত্র। আগুনে ধ্বংস হয়েছে ভলিউম বুক, বালাম বই, সূচিপত্র, টিপবইসহ যশোর ও আশপাশের এলাকার ঐতিহাসিক ও আইনি গুরুত্বসম্পন্ন অসংখ্য নথি।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে হঠাৎ করেই রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো ভবনে আগুন লাগে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলতে থাকে। এতে ১৭৪১ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়।
রেজিস্ট্রি অফিস মসজিদের মোয়াজ্জিন ও খাদেম শাহীন আগুন ও ধোঁয়া দেখতে পেয়ে মসজিদ কমিটির সভাপতি সরোয়ার হোসেনকে মোবাইলে বিষয়টি জানান। পরে ট্রিপল নাইনে ফোন দেওয়ার মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসকে অবহিত করা হয়।
যশোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার ফিরোজ আহমেদ জানান, আগুন লাগার সংবাদ পেয়ে রাত সোয়া ৯টার দিকে তাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তখন ভবনের মূল গেটে তালা দেওয়া ছিল এবং ভেতরে আগুন জ্বলছিল। কোনো স্টাফ সেখানে উপস্থিত ছিলোন না। তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
তিনি আরও জানান, পুরনো ভবনের দুটি কক্ষে রাখা পুরনো কাগজপত্র ও দলিলপত্র পুড়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ তদন্ত শেষে জানা যাবে।
যশোরের শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার শামসুজ্জামান মিলন, যিনি একসময় যশোর রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত ছিলেন, তিনি জানান এই ভবনে ১৭৪১ সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত যশোর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল, বালাম বই ও সূচিপত্র সংরক্ষিত ছিল। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ভবনের দরজা খোলা হতো না। আগুন লাগার সংবাদ পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, প্রায় সব কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিছু নথি আগুন নেভানোর সময় পানিতে নষ্ট হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত যশোর দলিল লেখক সমিতির সহসভাপতি সরোয়ার হোসেন জানান, রাত ৯টার পর আগুন লাগার খবর পান। ভবনের গেটে তালা মারা ছিল এবং সেখানে একজন নৈশপ্রহরী থাকার কথা থাকলেও আগুন লাগার সময় তাকে পাওয়া যায়নি। বাইরে থেকে আগুন দেখা গেলে স্থানীয়রা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন।
এলাকাবাসী ও আশপাশের দোকানদাররা আগুন লাগার ঘটনাকে অত্যন্ত রহস্যজনক বলে দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, ওই ভবনের ভেতরে কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই। ফলে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার সম্ভাবনা নেই। তারা ধারণা করছেন, পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়ে থাকতে পারে। পুলিশ প্রশাসনের সুষ্ঠু তদন্ত হলেই প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে বলে তাদের মত।
ঘটনার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ,মোহরা শামসুজ্জামান মিলন, এক্সট্রা মোহরার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম ওরফ ছোট সাইফুল, নৈশ্য প্রহরি হীরা ও রবিউল ইসলাম সহ আরো কয়েক জন নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে রেজিস্ট্রি অফিসের পুরনো বালাম ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডে টেম্পারিং, পাতা ছেঁড়া ও তথ্য বিকৃত করে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে আদায় করে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের কয়েকজন সদস্য পূর্বেও বালাম বই ছেঁড়া ও কাটাকাটির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হলেও পরে নানা উপায়ে পুনরায় চাকরিতে ফিরে আসে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এত বড় একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্টার কিংবা রেকর্ড কিপার কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি? তারা কি ঘটনাটি জানতেন না, নাকি কোনো কারণে জানানো হয়নি এ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
সচেতন মহলের অভিমত, যাদের হাতে রাষ্ট্রের এত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক দলিলের দায়িত্ব, তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সুষ্ঠু অনুসন্ধান হলেই এই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং পেছনের রহস্য উদঘাটিত হবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
ঘটনাটি যশোরে প্রশাসনিক মহলে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। #