মোঃ খোরশেদ আলম কলারোয়া (সাতক্ষীরা) গ্রামের দাদি- চাচিদের মুখে শুনা একটি প্রাবাদ।”আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মৌ এত ডাকি তবু কথা কয় না কেনো বৌ”। আতা একটি সাধারণ ফল হিসেবে পরিচিত। গ্রামের বাগানে যত্রতত্র জন্মানো এই ফলটি আজ প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। বাড়ির আঙ্গিনায় ঝোঁপঝাড়ের মধ্যে জন্মাতো এই আতা গাছে। সেই সময় যত্রতত্র জন্মানো তাই এ ফলের তেমন একটা কদর ছিল না। গাছে পাকা ফল সুস্বাদু, তাই খাদ্য হিসেবে পাখিদের এই ফল খুব প্রিয়। আর সুস্বাদু হওয়ায় গ্রামের ছেলেরা বাবা- মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাগানের গাছ থেকে ফল পেড়ে খেতো। এতে বকাঝকা শুনতে হতো সকলের। বাড়ির আঙ্গিনায় ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার ফলে আতা ফলের গাছ এখন আর তেমন একটা দেখা যায় না। আর এই পুষ্টিগুণে ভরপুর গ্রামের আতাফল প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে।
এই ফলের গাছটি প্রায় ১০/১৫ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। ফলটি দেখতে অনেকটা হৃৎপিন্ডের আকৃতির । তবে এই ফলের আকার লালচে ও মসৃণ চর্মযুক্ত। অযত্নে অবহেলায় আতাফলের যত্রতত্র চারা জন্মানো আর ফলও ধরে খুব সহজে। স্বাদে খুব সুস্বাদু কিন্তু খেতে হালকা নোনতা। গ্রামের প্রায় বাড়ির আঙ্গিনায় দুই একটি আতা গাছ দেখা যেত। আবার কোন কোন এলাকায় এটি নোনা ফল নামেও পরিচিত। স্বাদের দিক থেকে কিছুটা নোনতা হওয়ার কারণে এর নামকরণ এমনটি হয়েছে বলে মনে হয়। পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফলটি সহজে পেট ভরাতে সাহায্য করে। অনেকের কাছে আতাফল খুবই পছন্দের।
পুষ্টিগুণে ভরপুর এই সহজলভ্য ফলটির প্রতি ১০০ গ্রামে গ্রামে আছে শর্করা ২৫ গ্রাম, পানি ৭২ গ্রাম, প্রোটিন ১.৭ গ্রাম, ভিটামিন এ ৩৩ আইইউ, ভিটামিন সি ১৯২ মিলিগ্রাম , থিয়ামিন ০.১ মিলিগ্রাম, রিবোফ্লাবিন ০.১ মিলিগ্রাম, নিয়াসিয়ান ০.৫ মিলিগ্রাম, প্যানটোথেনিক অ্যাসিড ০.১ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩০ মিলিগ্রাম,আয়রন০.৭মিলিগ্রাম , ম্যাগনেসিয়াম ১৮ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ২১ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ৩৮২ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ৪ মিলিগ্রাম।
জানা যায়, আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, গুণে ভরা আতাফল। সাধারণ এই ফলের অসাধারণ ওষুধি গুণ ও উপকারিতা রয়েছে । আতাফলের ওষুধি গুণ আতাগাছের শেকড়ের ছাল আমাশয়ের ওষুধ ও শাঁসের রস রক্তের শক্তি বৃদ্ধিকারক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অপুষ্টিজনিত সমস্যায় এর রসের সাথে দুধ মিশিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। যে ফোঁড়া পাকে না আবার বসেও না, এমন ফোঁড়ায় আতার বীজ বা পাতা বেটে সামান্য লবণ মিশিয়ে প্রলেপ দিলে ফোঁড়া পেকে পুঁজ বের হয়ে যায়। পাতার রস উকুননাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
আতাফলে থাকা উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। দুরারোগ্য ব্যাধিকে তাড়িয়ে শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া খাদ্য উপাদান এনিমিয়া প্রতিরোধ করে থাকে। হাড় মজবুত করতে আতা ফলে প্রচুর ক্যালসিয়াম বিদ্যমান। আর শরীরের হাড় গঠন ও মজবুত রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমানে ক্যালসিয়াম সরবারহ করতে সক্ষম এই ফলটি। খাবারের হজম শক্তি বাড়িয়ে তুলতে আতাফলে থাকা ফসফরাস উপকারী ভূমিকা পালন করে থাকে। এর খাদ্যআঁশ হজমশক্তি বৃদ্ধি করে ও পেটের সমস্যা দূর করে।
আতাফল শরীরের ডিএনএ ও আরএনএ সংশ্লেষণ শক্তি উৎপাদনের জন্য ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন সি ও খনিজ পদার্থ সমূহ সরবরাহ করে থাকে। এ ফলে রিবোফ্লাভিন ও ভিটামিন সি আছে। আর এই ভিটামিন উপস্থিতির কারণে দৃষ্টিশক্তি বাড়ে। সেক্ষেত্রে আতা ফল অনেক সহায়ক। চুল ও ত্বকের যত্নে আতা ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা একটি উন্নতমানের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং ফ্রি রেডিক্যাল নিয়ন্ত্রণে রক্ষা করে। এছাড়া ত্বকে বার্ধক্য বিলম্বিত করে। এতে উপস্থিত ভিটামিন এ চোখ, চুল ও ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। এই ফলে ম্যাগনেসিয়াম মাংসপেশির জড়তা দূর করে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে থাকে। পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি৬ রক্তের উচ্চচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।