যশোরের ছাতিয়ানতলা পারকুল গ্রামের নিরিবিলি রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটলে হঠাৎ চোখে পড়ে সারি সারি কাঠের বাক্স। কাছে গেলে বোঝা যায় এগুলো কোনো সাধারণ বাক্স নয়, বরং শত শত মৌচাক। চারপাশে লিচু বাগানের মিষ্টি সুবাস, আর সেই সুবাসে ব্যস্ত মৌমাছিদের গুঞ্জন যেন এক অনন্য প্রাকৃতিক সিম্ফনি। এই ব্যতিক্রমী দৃশ্যের পেছনের কারিগর শরীয়তপুরের সিকদার কান্দি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা আনোয়ার, পিতা আলী আকবর মোল্লা।
আনোয়ারের মৌচাষ পদ্ধতি একদিকে যেমন পরিকল্পিত, তেমনি প্রকৃতিনির্ভর। তিনি মৌমাছির খাদ্য ও ফুলের মৌসুমকে কেন্দ্র করে স্থান পরিবর্তন করে থাকেন। লিচুর মৌসুমে তিনি যশোরের এই বাগানে এসে বসিয়েছেন প্রায় ২৫০টি মৌচাক। মাত্র বিশ দিনের মধ্যে তিন দফায় মধু সংগ্রহ করে পেয়েছেন প্রায় তিন হাজার কেজি মধু। প্রতিকেজি ৫০০ টাকা হিসেবে যার বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ টাকা যা একজন তরুণ উদ্যোক্তার সফলতার উজ্জ্বল উদাহরণ।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও সঠিক সময় নির্বাচন। আনোয়ার জানান, মৌচাষের মৌসুম শুরু হয় বড়ই ফুল দিয়ে। এরপর সরিষা ফুল, তারপর লিচু বাগান, এবং বছরের একটি বড় অংশ জুড়ে তিনি সুন্দরবনের গোলপাতা ও কেওড়া ফুলের ওপর নির্ভর করেন। ফুলের এই বৈচিত্র্যই তার মধুর স্বাদ ও গুণগত মানকে করে তোলে আলাদা।
তার এই খামারে বর্তমানে পাঁচজন কর্মচারী কাজ করছেন। কর্মচারীদের মাসিক বেতন ৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। এতে শুধু তার নিজেরই নয়, আরও কয়েকটি পরিবারের জীবিকা নিশ্চিত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তবে এই সফলতার গল্পের পেছনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও। মৌমাছির খাদ্য নিশ্চিত করা তার মধ্যে অন্যতম। বছরে প্রায় ছয় মাস মধু সংগ্রহের মৌসুম থাকলেও বাকি সময় মৌমাছিদের বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত খাবার সরবরাহ করতে হয়। আনোয়ার জানান, ২৫০টি মৌচাকের জন্য প্রায় আড়াইশো বস্তা চিনি সংগ্রহ করতে হয়, যা পানিতে গুলে প্রতিদিন মৌমাছিদের খাওয়ানো হয়। এতে খরচ যেমন বেশি, তেমনি প্রয়োজন হয় নিরবচ্ছিন্ন যত্ম ও তদারকি।
মৌচাষের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিরাপত্তা ও পরিবেশ। রাতে চুরি বা প্রাকৃতিক ঝুঁকি এড়াতে বাড়তি নজরদারি রাখতে হয়। পাশাপাশি আবহাওয়া, কীটপতঙ্গ এবং ফুলের প্রাপ্যতার ওপরও নির্ভর করে উৎপাদন। সবকিছু সামলে আনোয়ার বড় খরচ শামলায় বছরের শেষে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা লাভ করতে সক্ষম হন।
আনোয়ারের এই উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, বরং কৃষি ও পরিবেশের জন্যও উপকারী। মৌমাছির পরাগায়নের মাধ্যমে লিচু, সরিষা ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন বাড়ে। ফলে এটি একটি সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে।
তার এই ভ্রাম্যমাণ মৌচাষ পদ্ধতি নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য হতে পারে অনুপ্রেরণা। অল্প পুঁজি, সঠিক পরিকল্পনা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে কীভাবে একটি লাভজনক ব্যবসা গড়ে তোলা যায় তার বাস্তব উদাহরণ আনোয়ার।
গ্রামের শান্ত পরিবেশে মৌমাছির গুঞ্জনের সাথে মিশে আছে এক তরুণের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প। লিচুর সুবাসে ভেসে বেড়ানো এই মধুর খামার যেন বলে দেয় প্রকৃতিকে ভালোবেসে, তাকে সঙ্গী করে এগোলে সফলতা ধরা দেয় একদিন ঠিকই।