গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী খুলনা মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। চলতি বছরের শেষ দিকেও তেমন সু-খবর নেই নগরবাসীর জন্য। পুলিশ বলছে মাদক, আধিপত্য বিস্তার, অবৈধ অস্ত্র আর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে হত্যার ঘটনা ঘটছে। সবশেষ গত সোমবার গুলীবিদ্ধ হন জাতীয় নাগরিক পার্টির শ্রমিক সংগঠন জাতীয় শ্রমিক শক্তির খুলনা বিভাগীয় আহবায়ক মোতালেব শিকদার। এমন পরিস্থিতিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও নাগরীক সমাজের প্রতিনিধিরা।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) তথ্য বলছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত নগরীর আটটি থানায় ৩৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। ১১ ডিসেম্বর নগরীর ট্রাঙ্ক রোডে ভাড়াবাসায় হত্যার শিকার হন শিউলি (৪৫) নামের এক গৃহবধূ। হত্যার পর থেকে নিহতের ছেলে পলাতক। নভেম্বরের শেষে খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে দু’জনকে গুলী করে ও কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নগরীর লবণচরা থানায় একটি বাসা থেকে এক নারী ও দুই শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই দিনই সন্ধ্যায় নগরীর করিমনগরে একটি বাসায় স্ত্রীর সামনে এক যুবককে গুলী করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়, যিনি দীর্ঘদিন মাদক মামলায় কারাবন্দি থেকে সম্প্রতি জামিনে বের হয়েছিলেন।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, গণঅভ্যুথান পরবর্তী সময়ে খুনোখুনি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ নগরীর অনেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী জামিনে বেরিয়ে এসেছে। এ সব অপরাধী এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া। এতে চাঁদাবাজি, মাদক সা¤্রাজ্য নিয়ন্ত্রণসহ অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে পারস্পারিক দ্বন্দ্ব বাড়ছে। তাদের হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র পরিস্থিতিকে আরও বেসামাল করে তুলছে।
এদিকে, মহানগরীর ভোটকেন্দ্রগুলোর ঝুঁকি যাচাই করে ৩০৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭৯টিকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং ১২৮টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। এ হিসেবে ৬৭ শতাংশ ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার জাহিদুল হাসান গত ১৮ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে বলেন, “খুলনার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা কঠোর ও অনমনীয় থাকব, কিন্তু পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং সেবার মান উন্নয়নে সমান গুরুত্ব দেব। মাদক, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, নারী ও শিশু নির্যাতন, চাঁদাবাজি এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি মেনে চলব।
উপজেলার পরিস্থিতিও খারাপ। জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত জেলায় ৬৩টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রূপসা থানায় ১৫টি, তেরখাদা থানায় দুটি, দিঘলিয়া থানায় চারটি, ফুলতলা থানায় ১০টি, ডুমুরিয়া থানায় ১১টি, বটিয়াঘাটা থানায় চারটি, দাকোপ থানায় সাতটি, পাইকগাছা থানায় চারটি ও কয়রা থানায় পাঁচটি হত্যার ঘটনা ঘটে। হত্যাগুলোর মধ্যে গুলী করে পাঁচটি, গুরুতর জখম করে তিনটি, অজ্ঞাত কারণে ৯টি, শ্বাসরোধে দুটি, পরকীয়ার কারণে পাঁচটি, আর্থিক ও ব্যবসায়িক কারণে পাঁচটি ঘটনা ঘটে। তদন্তাধীন ১৯টি ঘটনার মধ্যে জেলা পুলিশ ১১টি ও নৌ পুলিশ আটটি ঘটনা তদন্ত করছে।
খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনা জেলার ৫৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ। তালিকার শীর্ষে রয়েছে পাইকগাছা। এ উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে ৩৫টি কেন্দ্র। এছাড়া কয়রার ১৪টি, ডুমুরিয়ার ২৭টি, ফুলতলার চারটি, দিঘলিয়ার আটটি, তেরখাদার ছয়টি, রূপসার ২৩টি, দাকোপের ১৩টি ও বটিয়াঘাটার পাঁচটি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ।
খুলনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) জানান, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মাফিক আমরা কাজ করছি। জেলার ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। এছাড়া বিগত দেড় বছরের ঘটা অধিকাংশ হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। অনেকগুলো তদন্তনাধীন। একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থাকবে।
খুলনা জেলা বিএনপির আহবায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে পরাজিত শক্তি নানান ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আমাদের প্রত্যাশা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে আন্তরিক হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।