আশাশুনি থেকে (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা : সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নের বিছটে খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে ১০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভেসে গেছে কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি, মৎস্য ঘের ও পোল্ট্রি মুরগির খামার। প্লাবিত এলাকার বানভাসি মানুষ সহায় সম্বল হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ভাঙ্গন পার্শ্ববর্তী পাউবো বাঁধের উপরে। মানুষ ও গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

প্রতক্ষদর্শী, স্থানীয় সূত্রে ও সরজমিন ঘুরে জানাগেছে, বিছট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন পশ্চিম ধারে পাউবো’র বেড়িবাঁধে বেশ কিছু দিন পূর্বে ফাটল দেখা দিয়েছিল। এতে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হলে স্থানীয় বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে নিঃর্ঘুম রাত কাটাতে থাকে। অবশেষে গত ৩১ মার্চ সোমবার (ঈদ-উল-ফেতরের দিন) সকাল আনুমানিক ৯ টার দিকে জোয়ারে চাপে বাঁধ ছাপিয়ে খোলপেটুয়া নদীর লোনা পানি ভেতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। স্থানীয়রা জানতে পেরে বাঁধ রক্ষা করার চেষ্টা করার আগেই বাঁধের ১০/১৫ হাত ভেঙ্গে নদীগর্ভে চলে যায়। ফলে নদীর পানি প্রবল বেগে ভেতরে প্রবেশ করে বিছট গ্রাম প্লাবিত হয় ঘরবাড়ি, মৎস্য ঘের, ফসলি জমি, পুকুর, পোল্ট্রি ফার্ম।

ঈদ-উল-ফেতরের নামাযরত অবস্থায় মুঠোফোনে খবর পেয়ে আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ত্বরিত সিদ্ধান্তে ৯ টার দিকে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ শুরু করে প্রাথমিকভাবে ছোট করে রিং বাঁধ দেয়। কিন্তু দুপুর ১২ টার দিকে জোয়ারের পানি অধিক ফেপে রিং বাঁধ ছুটে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ৪০/৫০ ফুট বাঁধ ভেঙ্গে যায় এবং প্রবল বেগে ভেতরে পানি প্রবেশ করতে থাকে। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৃষ্ণা রায়, সাতক্ষীরা থেকে পাউবো কর্তৃপক্ষ উপজেলা পর্যায়ের বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। জোয়ারের পানি ভেতরে প্রবেশ ও ভাটায় নদীতে পানি নিষ্কাশনকালে বাঁধের ভাঙ্গন বাড়তে বাড়তে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত (১ এপ্রিল সন্ধ্যা) বাঁধ ভেঙ্গে প্রায় ৩০০ ফুট নদীগর্ভে চলে গেছে। ইউনিয়নের বিছট, নয়াখালী, বল্লভপুর, আনুলিয়া, কাকবাসিয়াসহ ১০ গ্রাম পানিতে ডুবে প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ১২ শত পরিবার। পানিতে ডুবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার বিঘা মৎস্য ঘের, ২১ হেক্টর ফসলি জমি, পুকুর, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামার। ১০০ এর অধিক কাঁচা ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে ভেঙ্গে গেছে। এসব প্লাবিত এলাকার মানুষের রান্না খাবার, হাঁস-মুরগি ও গো খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে। প্লাবিত এলাকার বানভাসি মানুষ পার্শ্ববর্তী আশ্রয়কেন্দ্র ও পাউবো’র বাঁধে খোলা আকাশের নীচে আশ্রয় নিয়েছে। আবার কেউ কেউ অন্য গ্রামে আত্মীয়ের বাড়ী উঠেছে। মাঝে মাঝে বেশ কিছু যুবককে পানিবন্দী এলাকার মানুষের মাঝে শুকনা খাবার সরবরাহ করতে দেখা গেছে।

সিনিঃ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিত মজুমদার জানান, নদীর পানিতে এ পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৩৫০ টি মৎস্য ঘের ভেসে গেছে। প্রায় ৪হাজার ৫ শত বিঘা জমির মৎস্য ঘেরের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ শুভ্রাংশু শেখর দাশ বলেন, প্রাথমিক হিসাবে ২০ হেক্টর জমির ধান ক্ষেত ও দেড় হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বাঁধ রক্ষা না হলে এলাকার ধান, সবজি, তরমুজচাষিরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোস্তাক আহমেদ জানান, পাউবো’র ১ ও ২ নং পোল্ডারের কর্মকর্তাদের একত্র হয়ে পরিকল্পিতভাবে কাজ করে দ্রুত বাঁধ বাধার কাজ সম্পন্ন করতে বলেছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাঁধ বাঁধা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, বাঁধ বাঁধার কাজ সম্পন্ন করার দ্রুত পরিকল্পনা চালাচ্ছি। আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে তা সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি সকলকে আশ্বস্ত করেন।

ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুন জানান, আগামী ৪/৫ দিনের মধ্যে যদি বাঁধ বাঁধা সম্ভব না হয় তাহলে পার্শ্ববর্তী খাজরা, বড়দল ও প্রতাপনগর এলাকা প্লাবিত হবে। ভাঙ্গনস্থান পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৃষ্ণা রায়, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মুহাদ্দিস রবিউল বাশার, আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান রুহুল কুদ্দুস, প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ ঢালী, উপজেলা বিএনপি’র সাবেক আহ্বায়ক স.ম. হেদায়েতুল ইসলাম, উপজেলা জামায়াতের আমীর আবু মুছা তারিকুজ্জামান তুষার, নায়েব আমীর মাওঃ নুরুল আফসার মোর্তাজাসহ স্থানীয় জনপ্রতিধি, উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাকর্মীবৃন্দ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।