নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বকেয়া বেতন ভাতা শ্রমিক ছাটাই ও শ্রমিক নির্যাতনের প্রতিবাদে একটি রপ্তানি মুক্তি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মাঝে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ঢাকা সিলেট মহাসড়কে ১২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এ দিকে তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবীকে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা।

নাজমুল হুদা, রূপগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে শনিবার সকাল ৮টায় উপজেলার মৈকুলি এলাকার বি ব্রাদার্স কোম্পানি লিমিটেড নামে পোশাক কারখানায় এ শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয়।

ভুক্তভোগী শ্রমিক ও স্থানীয়রা বলেন, মৈকুলি এলাকার বি ব্রাদার্স কোম্পানি লিমিটেড নামে পোশাক কারখানায় প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মচারী কাজ করেন। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসের বকেয়া বেতন ভাতার দাবি জানিয়ে আসছেন শ্রমিকরা। মালিকপক্ষ দেই দিচ্ছি করে বেশ কয়েকদিন ধরে তাদের ঘুরাচ্ছেন। যারা প্রতিবাদ করছেন তাদের আটকে রেখে নির্যাতন চালাচ্ছেন এবং শ্রমিক ছাঁটাই করছেন। এ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই শ্রমিক এবং মালিকপক্ষ বিরোধ চলে আসছে।

শনিবার সকাল ৭টায় শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে কাজে যোগদান না করে তাদের দাবি দাওয়া নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে কিছু শ্রমিক কারখানার সামনে অবস্থান নেন। বাকি শ্রমিক কারখানা কর্তৃপক্ষ ভেতরেই আটকে রাখেন। এ নিয়ে কারখানার ভিতরে এবং বাইরের শ্রমিকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাহিরে থাকা শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। উত্তেজিত শ্রমিকা ঢাকা সিলেট মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। এতে সড়কের উভয় পাশের সকল ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কারখানার ভেতরে এবং বাইরে শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে মালিকপক্ষ ভেতরে থাকা শ্রমিকদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। পরে শ্রমিকরা বের হয়ে তাদের মধ্যে আরও বেশি অসন্তোষ দেখা দেয় এবং উত্তেজিত হয়ে ওঠে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক গ্রাউন্ড টিয়ারসেল নিক্ষেপ করেন। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ, ইট পাটকেল নিক্ষেপ ও টিয়ারসেল নিক্ষেপে শ্রমিক, পুলিশ, সাংবাদিক, পথচারীসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। উত্তেজিত শ্রমিকরা ঢাকা সিলেট মহাসড়ক প্রায় ৬ ঘন্টা অবরোধ করে রেখেছেন । এতে সড়কের উভয় পাশে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী সাধারণ থেকে পথচারীরা।

দুপুর দুইটার দিকে রূপগঞ্জ আর্মি ক্যাম্পের একদল সেনাবাহিনী সদস্য ঘটনাস্থলে সে শ্রমিকদের বুঝিয়ে শুনিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেন এবং যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক করে দেন। পরে শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে মালিকপক্ষের কাছ থেকে আদায় করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে শ্রমিকরা শান্ত হন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, নারায়ণগঞ্জ-১ রূপগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু ও রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম।

এ সময় রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের যে কোন সমস্যা সমাধান করতে আমরা উপজেলা প্রশাসন সব সময় কাজ করে থাকি। এ বিষয়টি আমাদের জানানো হলে আমরা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আগেই সমস্যা সমাধান করতে পারতাম।

নারায়ণগঞ্জ-১ রূপগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূইয়া দিপু শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনাদের দাবি-দাওয়া যে বিষয়টি রয়েছে তা মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আদায় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করব আমি কথা দিলাম। এজন্য আমাকে একটু সময় দিতে হবে। শ্রমিকরা আছে বলেই আমাদের এই শিল্পকলা কারখানা বেঁচে আছে। তাই শ্রমিক বেঁচে থাকলেই শিল্প কলকারখানা বেঁচে থাকবে।

স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর জানান, তিন মাসের বকেয়া বেতন পরিশোধ না করেই হঠাৎ কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে গাজীপুরের টঙ্গীতে শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। শনিবার দুপুরে টঙ্গী প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেন টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন কাঠালদিয়া এলাকায় অবস্থিত আলট্রা ওয়াশিং অ্যান্ড ডাইং লিমিটেড কারখানার দেড় শতাধিক শ্রমিক।

শ্রমিকদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা বা নোটিশ ছাড়াই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে তিন মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বেতন না পেয়ে শ্রমিকদের পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকের ঘরে চুলা জ্বলছে না, শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, ঘরভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তারা।

কারখানার শ্রমিক জাকির হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষ বারবার সময় নিয়ে শুধু আশ্বাসই দিয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত এক টাকাও পরিশোধ করা হয়নি। কারখানা কবে চালু হবে, সে বিষয়েও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। এতে শ্রমিকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

মানববন্ধন শেষে শ্রমিকরা কারখানার গেটে গিয়ে বিক্ষোভ করেন এবং দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ ও কারখানা পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার দাবি জানান। দাবি মানা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তারা।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কারখানা কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি।