নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : “৩৪ বছরের প্রবাস জীবনের সব সঞ্চয় ও ব্যবসা হারিয়ে আমি এখন দিশেহারা। প্রতারকদের কারণে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি”-চট্টগ্রামের আদালতে দাঁড়িয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে এভাবেই নিজের জীবনের সর্বনাশের কথা বলেন সৌদি প্রবাসী ব্যবসায়ী মো. নুরুল আলম।

একসময় যিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রমী প্রবাসী উদ্যোক্তা, আজ তিনি নিঃস্ব। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় সৌদি আরবে থেকে ব্যবসা করে দেশে পাঠিয়েছিলেন কষ্টার্জিত অর্থ। সেই অর্থেই গড়ে তুলেছিলেন দোকান, জমি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এক ভয়াবহ প্রতারণার জালে পড়ে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় দায়ের হওয়া একটি আলোচিত প্রতারণা মামলায় (মামলা নং-০৪, তারিখ ০২/০৫/২০২৬) তিনি আদালতে জবানবন্দি দেন। মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৪০৬, ৪২০, ৩৭৯, ১১৪ ও ৫০৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

ভিকটিম মো. নুরুল আলম (৫৫) চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা। তিনি মৃত ছৈয়দুর রহমানের ছেলে। মামলাটি দায়ের করেন তার ছেলে রুবায়েত আলম (২৬)। তদন্তে উঠে এসেছে, একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র পরিকল্পিতভাবে তাকে বিশ্বাসের জালে ফাঁসিয়ে কোটি কোটি টাকা, দোকান ও জমি হাতিয়ে নিয়েছে।

আত্মীয়তার আড়ালে প্রতারণার শুরু: জবানবন্দিতে নুরুল আলম জানান, মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ শুয়াইব তার আত্মীয় ও পরিচিত হওয়ায় শুরু থেকেই তার ওপর আস্থা ছিল। সেই আস্থার সুযোগ নিয়েই প্রথম ধাপে তাকে জমি কেনা ও ব্যবসায়িক লাভের কথা বলে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে তার কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়। শুরুতে বিষয়টি স্বাভাবিক ব্যবসা মনে হলেও পরবর্তীতে তা ভয়াবহ প্রতারণায় রূপ নেয়।

“গুপ্তধন” নাটক ও প্রলোভনের জাল: ২০২৩ সালের শেষ দিকে শুয়াইব আবার নুরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে “ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার” আশ্বাস দেয়। এরপর তাকে আগ্রাবাদের একটি ট্রাভেল অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে মাহফুজুর রহমানসহ অন্যদের সঙ্গে তার পরিচয় করানো হয়। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চকরিয়া ও ডুলাহাজারার পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে একটি বোতল দেখিয়ে বলা হয়, এর ভেতরে রয়েছে মূল্যবান গুপ্তধন। আলোতে ধরলেই রহস্যময়ভাবে আলো নিভে যাওয়া-এমন কৌশল ব্যবহার করে তাকে মানসিকভাবে প্রভাবিত করা হয়। নুরুল আলম জানান, সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতেই পারেননি এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা। বিশ্বাস করে ফেলেন এটি সত্যিকারের মূল্যবান সম্পদ।

কোটি টাকার লেনদেন ও ধাপে ধাপে সর্বস্ব হারানো: এরপর শুরু হয় টাকার চাপ। তাকে বলা হয় পাহাড়ি লোকজন ও বিদেশি ক্রেতাদের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। প্রথমে ১ কোটি টাকা, পরে ধাপে ধাপে আরও প্রায় ৩ কোটি টাকা তিনি প্রদান করেন ব্যাংক ও নগদে। কিন্তু প্রতারণা এখানেই থেমে থাকেনি। পরবর্তীতে তাকে জানানো হয়, গুপ্তধন সেনা ক্যাম্পে আটক হয়েছে এবং একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী এটি ছাড়ানোর জন্য বিপুল টাকা দাবি করছেন। আগের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় তিনি আরও অর্থ দিতে থাকেন। একপর্যায়ে ২০২৫ সালের শেষ দিকে তাকে বলা হয়, ৬৫ লাখ টাকায় “চূড়ান্ত সমাধান” হবে। তখন তিনি নিজের আগ্রাবাদের ১০৬ নম্বর দোকান বিক্রি করে পুরো টাকা মাহফুজুর রহমানের অ্যাকাউন্টে পাঠান।

জমি ও দোকান বন্ধক দিয়ে সর্বনাশের শেষ ধাপ: এরপরও টাকা চাওয়া বন্ধ হয়নি। পরে তাকে টেরিবাজারের চারটি দোকান এবং কক্সবাজারের খুরুশকুল এলাকার ২৪ শতক জমি তিন মাসের জন্য বন্ধক দিতে বাধ্য করা হয়। তাকে আশ্বস্ত করা হয়, তিন মাসের মধ্যে গুপ্তধন বিক্রি হয়ে গেলে সব সম্পত্তি ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এসব সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রতারক চক্র। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এসব দলিল ও আমোক্তারনামা আসামিদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

হামলা, ভয়ভীতি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ: ভিকটিম আরও জানান, চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে আগ্রাবাদ হোটেলে বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে বৈঠকের কথা বলে চট্টগ্রামে আনা হয়। পথে মইজ্জারটেক এলাকায় বাস থামিয়ে ১০–১২ জন তাকে জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে শুয়াইব ও মাহফুজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি দাবি করেন। তাকে মারধর করে কাছ থেকে “গুপ্তধন”, ১৮০০ মার্কিন ডলার, ২৩০ সৌদি রিয়াল, নগদ টাকা এবং ব্যাংকের চেকবই ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

তদন্তে উঠে আসছে সংঘবদ্ধ চক্রের ইঙ্গিত: পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। মাহফুজুর রহমানের ১৪টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও চেকবই উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যাংক স্টেটমেন্টে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পরিতোষ দাশ আদালতকে জানান, আসামিরা প্রভাবশালী ও সংঘবদ্ধ। তারা জামিনে বের হয়ে সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তদন্ত প্রভাবিত করতে পারে।

এক প্রবাসীর ভেঙে পড়া জীবন: সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব নুরুল আলম। আদালতে দেওয়া জবানবন্দির প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠেছে তার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কষ্ট, বিশ্বাসভঙ্গের বেদনা এবং সর্বস্ব হারানোর হাহাকার। তিনি বলেন, “আমি ৩৪ বছর ধরে বিদেশে পরিশ্রম করেছি। সবকিছু হারিয়ে আজ আমি নিঃস্ব। প্রতারকদের কারণে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি।”এই একটি বাক্যেই যেন থেমে গেছে একজন প্রবাসীর জীবনের অর্জন, সংগ্রাম আর স্বপ্ন। এখন তার সামনে শুধু আদালতের বিচার এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষা।

মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামিরা হলেন- সাতকানিয়ার চিববাড়ী খন্দকারপাড়ার মোহাম্মদ শুয়াইব, সন্দ্বীপের বাসিন্দা বর্তমানে আকবরশাহ এলাকায় বসবাসরত মাহফুজুর রহমান এবং আকবরশাহ বিশ্ব কলোনীর আমিন হোসেন। ইতোমধ্যে প্রধান আসামি শুয়াইব আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

কর্ণফুলী থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই পরিতোষ দাশ বলেন, “এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। তারা অত্যন্ত কৌশলে একজন প্রবাসী ব্যবসায়ীকে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করেছে। মামলার তদন্ত চলছে, আরও তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।