২৪-এর স্মরণকালের ভয়ংকর বন্যার এক বছর না পেরোতেই জেলায় ফের ভয়াবহ বন্যা

তিন উপজেলার সাথে জেলা শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ৪০ গ্রাম নিমজ্জিত

ফেনী সংবাদদাতা : মারাত্মক বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে ফেনীর ৪ উপজেলা। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত ১২টা পর্যন্ত পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার আংশিক অংশে ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যাদুর্গত ৬ হাজার ৮২৬ জন মানুষ অবস্থান নিয়েছেন। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নামলেও ভারতীয় পানির প্রচন্ড চাপ অব্যাহত রয়েছে। ফলে যেসব স্থানে বাঁধ ভেঙে গেছে সেসব ভাঙন কবলিত এলাকা দিয়ে তীব্র বেগে পানি প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদরের ৪০ গ্রাম পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। জেলা শহরের সাথে বিচ্ছিন্ন রয়েছে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সড়ক যোগাযোগ। অপরদিকে মুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়। এবারও উপজেলার মাটিয়াগোধা, দক্ষিণ সতর নদীরকূল, সতর, উত্তর পানুয়া, কাশিপুর, নিচিন্তা, লক্ষ্মীপুরসহ ১০টিরও বেশি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।

পরশুরাম-ফুলগাজীর ভাঙন স্থান দিয়ে আসা পানিতে ছাগলনাইয়া উপজেলা প্লাবিত হচ্ছে। সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে পানির চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে যদি বৃষ্টি হয় তাহলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবল চাকমা বলেন, মাঠপর্যায়ে থেকে দুর্গত মানুষের সহায়তায় আমরা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছি। উপজেলায় ৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে ছাগলনাইয়ার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র বেগে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

ফুলগাজীর ঘনিয়ামোড়ার ভাঙন স্থান দিয়ে তীব্র স্রোতে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় আরও বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে। ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, জেলায় টানা তিন দিন ধরে মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। বুধবার (৯ জুলাই) রাত ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন, রাত ১১টার দিকে নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীর পানি কমলেও ভাঙন স্থান দিয়ে পানি ঢুকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানি কমার পরেই বাঁধ মেরামতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফেনী জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বলেন, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার আংশিক অংশে অন্তত ২০ হাজার মানুষ দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৭ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। জেলার ছয় উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য সাড়ে ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বিজিবি, উপজেলা প্রশাসন সমূহ, বেসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রাজনৈতিক দল সমূহ এক যোগে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে। জেলা জামায়াতের আমীর মুফতি আবদুল হান্নান উপজেলা জামায়াত সমূহকে সাথে নিয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। সাবেক জেলা আমীর অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঁইয়াও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছেন।

ফুলগাজী - পরশুরামে পানি কমলেও বেড়েছে জনদুর্ভোগ -

ফুলগাজী সংবাদদাতা : টানা বর্ষণ ও মুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফেনীর ফুলগাজী-পরশুরামে বন্যায় ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গত ৩ দিনে দুইটি উপজেলার ২১ টি নদী রক্ষাকারী বাঁধ ভেঙে প্রায় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে পানি কিছুটা কমতে শুরু করে।

ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির বিশেষ টিম,ফেনী যুব রেড় ক্রিসেন্ট উদ্ধার ও ত্রাণ-সাহায্য নিয়ে কাজ করছে, পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি সহ ফেনী জেলা সেচ্ছাসেবী পরিবার স্থানীয়দের সহায়তায় কাজ করছে।

ফুলগাজী সদর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর আবুল কালাম শামীম উপজেলা জামায়াতের যুব বিভাগের সহায়তায় রান্নাকরা ও শুকনো খাবার সরবরাহে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগীরা বন্যার আগে-পরে “ ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়ীবাঁধ নির্মাণ চাই “ এই স্লোগান দিয়ে আসলেও বন্যাকালীন সময়ে ১ টি ত্রানের প্যাকেটই জেনো বেঁচে থাকার সম্বল। কেউ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে শতশত লোক। এইসব অঞ্চলে বন্যাদুর্গত মানুষের নূন্যতম ২ বেলা খাওয়ার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

যারা আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে তারা প্রশাসনের সাহায্য-সহায়তা পেলেও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন বাড়ীঘরে আশ্রয় নেওয়া নারী,শিশু, বৃদ্ধরা চরম দুর্ভোগের স্বীকার।

ফুলগাজী উপজেলা জামায়াতের আমীর মোঃ জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এইবার বন্যা-পরবর্তী আর বসে থাকার সুযোগ নেই, স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে সকল দল-মত একসাথে টেকসই বেড়ীবাঁধ নির্মাণ ও নদী সংস্কারে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।