তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, মর্যাদা ও মানবিক সহায়তার দিগন্ত প্রসারিত করতে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) এক ঐতিহাসিক কর্মশালার আয়োজন করেছে।

সোমবার গাজীপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের সেমিনার হলে দিনব্যাপী আয়োজিত ‘‘তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মূল ধারায় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয়’’ শীর্ষক এই কর্মশালায় দেশব্যাপী থেকে আসা তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।

কর্মশালার প্রধান অতিথি বাউবির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, “সমাজের সকল বাধা অতিক্রম করে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী যেন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয় এবং তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন হয়, সেটিই আমাদের চাওয়া। তাদের অন্তর্ভুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। ভবিষ্যতে চাকরিতে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে আমাদের নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের জীবনমান উন্নয়ন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের জন্য উচ্চশিক্ষার দরজা উন্মুক্ত রাখতে হবে। বাউবি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সাঈদ ফেরদৌস। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রো-ভিসি (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন এবং ট্রেজারার অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য শিক্ষার দরজা খোলা থাকা উচিত এবং বাউবি তার নামের যথার্থতা রক্ষা করে সকল স্তরের মানুষের মাঝে শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরা তাদের বাস্তব জীবনের করুণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তানিশা ইয়াসমিন চৈতি বলেন, “আমার জন্মটাই যেন অভিশাপ হয়ে এসেছে। একসময় পরিবার, স্কুল—সব কিছু থেকে ত্যাজ্য হয়ে অজানার পথে পা বাড়াতে হয়। পরিবার যেখানে প্রতিবন্ধী সন্তানকে আগলে রাখে, সেখানে আমাদের ত্যাগ করা হয়।’ প্রিয়া হিজরা বলেন, “শৈশব থেকে পরিবার ও সমাজের অবজ্ঞা, নিরাপত্তাহীনতা আর বঞ্চনার মাঝেই আমাদের বেড়ে ওঠা। এই কষ্টের গল্প প্রায় সবার জীবনেই এক।”

কর্মশালায় অংশ নেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধিরা ও বাউবির বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, ডিন, পরিচালক, আঞ্চলিক পরিচালকসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এবং তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার নিয়ে কাজ করা এনজিও প্রতিনিধি ও গবেষকরা।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য নমনীয় ভর্তি নীতি, বিশেষ শিক্ষা উপকরণ এবং মানবিক সহায়তার ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এসব বিষয় ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

এই উদ্যোগকে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা।

অনুষ্ঠানে রংপুরের পার্টিসিপেটরি এডভান্সমেন্ট সোস্যাল সার্ভিস (পাশ)-এর নির্বাহী পরিচালক ও গবেষক কে এম আলী সম্রাট উপাচার্যকে ‘লোককথা, পুঁথি সাহিত্য ও হিজরা জনগোষ্ঠীর ওপর রচিত গ্রন্থসমূহ’ উপহার হিসেবে প্রদান করেন।