একেএম আবদুর রহীম, ফেনী : ভূরাজনৈতিক দিক দিয়ে এবং ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে যেমন ফেনীর গুরুত্ব অপরিসীম, তেমনি রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের মাঝামাঝি অবস্থানের কারণে ফেনীর রয়েছে ভিন্নতর গুরুত্ব। ফেনীর উপর দিয়ে যেতে হয় নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরের মানুষদের। নোয়াখালীর সেনবাগ, কোম্পানিগঞ্জ, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রামের মিরসরাই এলাকার মানুষকে কেনাকাটা, চিকিৎসা সেবা থেকে শুরু করে যেকোন কাজে ফেনী না এসে উপায় নেই। ফলে আয়তনের দিক দিয়ে ছোট হলেও আশপাশের আরো পাঁচটি জেলার মানুষের হরদম যাতায়াত রয়েছে এই জেলায়। এখন কুমিল্লার লোকেরা কুমিল্লাকে বিভাগ করার আন্দোলন করছে, আবার নোয়াখালীর মানুষ নোয়াখালীকে বিভাগ করার দাবি করছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে বিভাগ যদি করতেই হয় ফেনীকে বিভাগ করা উচিত। যাই হোক সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। আমি সেদিকে যাচ্ছি না।
আমি ফেনীর গুরুত্ব নিয়ে কথা বলছিলাম। শুধু যে ফেনীর জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও মানুষ নানা প্রয়োজনে ফেনী যাতায়াত করছেন তাই নয় আরো বহু কারণে ফেনী দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা।
ভাটির বাঘ খ্যাত বীর বাঙ্গালী শমসের গাজীর ফেনী, পীর পাগলা মিয়ার স্মৃতিধন্য ফেনী। দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এই ফেনীরই সন্তান। ফেনীর মাটিতে শুয়ে আছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় আমীর মরহুম মকবুল আহমাদ। আরো বহু বরেণ্য ব্যক্তিত্ব এই জেলায় জম্ম নিয়েছেন যাঁরা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও খ্যাতি অর্জন করেছেন।
ফেনী রেমিটেন্সের দিক দিয়ে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ জেলা। ফেনীতে রয়েছে দেশের বৃহত্তম বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল যেখানে দশ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের কথা রয়েছে, আছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প, রয়েছে প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প, রয়েছে দেশের বৃহত্তম সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রয়েছে ১৩৩ কিঃমিঃ সীমান্ত ও ৮০ কিঃমিঃ উপকূলীয় রেখা। ফেনীতে রয়েছে স্থলবন্দর।
ফেনীতে যা নেই কিন্তু থাকা উচিত ছিল বহু বছর আগে থেকে। মেডিকেল কলেজ : ফেনীকে বলা হয় হাসপাতালের নগরী। অগণিত প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ফেনী শহরে। সরকারি জেনারেল হাসপাতালে গেলে মনে হবে এটা বোধহয় কোন স্টেডিয়াম, সেখানে মনেহয় ভারত বাংলাদেশ ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। ফেনী সহ আশপাশের পাঁচ জেলার রোগী উপছে পড়ছে। ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই অবস্থা। আশপাশের সব জেলায় মেডিকেল কলেজ বহু আগে থেকেই আছে অথচ ফেনীতে একটি মেডিকেল কলেজ নেই।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় : ফেনী একটি মিনি মেগাসিটিতে পরিণত হলেও এখানে নেই কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।কি দুর্ভাগ্য এই জেলা মানুষদের।
সেনানিবাস : ফেনী বাংলাদেশের চিকেননেক। অবৈধ আওয়ামী দুঃশাসনের অবসানের পর থেকে ভারতীয় গণমাধ্যম সরকারকে অনবরত উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিকেননেকে হামলা করে বাংলাদেশের মূল ভূখ- থেকে চট্রগ্রাম সহ ছয়টি জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার জন্য। কি ভয়বহ চক্রান্ত! তাই দেশের অখন্ডতা বজায় রাখতে হলে কাল ক্ষেপণ না করে অনতিবিলম্বে ফেনীতে একটি মিনি ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করতে হবে।
নদী বন্দর : ফেনী বাংলাদেশের দশটি উপকূলীয় জেলার একটি। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই জেলার সোনাগাজী উপজেলার রয়েছে ৮০ কিঃমিঃ তটরেখা। সাগরের তীরে জেগে উঠা বিশাল চরাঞ্চলে মিরসরাই ও সোনাগাজীতে গড়ে তোলা হচ্ছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক জোন। এর মোট আয়তন ৩৩ হাজার একর। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য একান্ত প্রয়োজন এখানে একটি নদী বন্দর। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। বন্দরের জেটি, পল্টুন নির্মাণের সরঞ্জাম সহ বিভিন্ন জিনিস নির্দিষ্টস্থানে আনা হয় যা ছবি সহ আমরা নিউজ করেছিলাম। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেন বিষয়টা চাপা পড়ে গেছে।
যেহেতু দেশের স্বার্থে বিশেষ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অঞ্চল এখানে করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই সেহেতু এই অর্থনৈতিক অঞ্চলকে দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় ও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে নৌবন্দর স্থাপনেরও কোন বিকল্প নেই।
বিমান বন্দর : ফেনীর পরিত্যক্ত বিমান বন্দরে মোট জমি আছে পৌনে চারশ’ একর। জাপান বৃটিশ যুদ্ধের সময় এই বিমান বন্দর স্থাপন করা হয়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রায় শত বছর পরিত্যক্ত হয়ে আছে এই বিমান বন্দর। একবার বিএনপি সরকার উদ্যোগ নিয়েছিল এখানে ইপিজেড করে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার। কিন্তু স্থানীয় কিছু মানুষের হটকারী সিদ্ধান্তে সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। কিছুদিন পরে সে জমিতে গড়ে উঠে মহিলা ক্যাডেট কলেজ। যেহেতু জমির মালিক সেনাবাহিনী। তাই তাদের কাজে বাধা দেয়ার কোন সুযোগ ছিলনা। ক্যাডেট কলেজ করায় কোন সমস্যা হয়নি, সমস্যা হয়েছে তারা এমন ভাবে ক্যাডেট কলেজের জন্য একশত একর জমি নিয়েছে যাতে বাকি পৌনে তিনশত একর জমি প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছে। ক্যাডেট কলেজের একশত একর জমি মোট জমির মাঝখান থেকে কেটে নেয়া। ফলে একদিকে অবশিষ্ট জমি গুলো অকেজো হয়ে রয়েছে অন্য দিকে যারা এসব জমি অবৈধ ভাবে দখল করে ভোগ করছে তারা কিছুটা বৈধতা পেয়ে গেল।কারন বাকি জমি গুলো উদ্ধারে হয়ত কোন উদ্যোগ আর কখনো নেয়া হবে না।
এখনো মোট জমির একপাশে ক্যাডেট কলেজকে স্থানান্তর করে বেহাত হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধার করা গেলে সে জমিতে একটি বিমান বন্দর নির্মাণ করা সম্ভব বলে অভিজ্ঞ মহল মত প্রকাশ করেছেন। তাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতি বিদেশীদেরকে আগ্রহী করে তুলতে ফেনীতে একটি বিমানবন্দর স্থাপন এখন সময়ের দাবি। জানা গেছে দেশের ৭টি পরিত্যক্ত বিমান বন্দর ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। তার মধ্যে ফেনী আছে কিনা জানা যায়নি। এছাড়াও রয়েছে আমাদের সোনাগাজীর ভয়াবহ নদী ভাঙন সমস্যা, ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ায় ভারতীয় পাহাড়ী ঢল এবং বর্ষা মৌসুমে তাদের ছেড়ে দেয়া পানিতে সৃষ্ট বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান, পরশুরামের মুহুরীর চরে ভারতীয় আগ্রাসন মোকাবেলা করা, সোনাগাজী ও কোম্পানিগঞ্জের মুছাপুরের সংযোগ স্থলে নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া স্লুইস গেটটি বিন্দুমাত্র সময় ক্ষেপন না করে পুনর্নির্মাণ করা, লালপোলে ফ্লাইওভার নির্মাণ, গুদাম কোয়ার্টারের রেল ক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ, একটি শিশু পার্ক নির্মাণ, জহির রায়হান মিলনয়তনটিকে অত্যাধুনিক করে পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি।