তীব্র তাপদাহের মধ্যে হঠাৎ ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাতক্ষীরাবাসী। দিনে-রাতে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় ২৪ লক্ষাধিক মানুষ। এতে প্রচণ্ড গরমে জনজীবনে উঠছে নাভিশ্বাস। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছে আসন্ন এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থীরা। পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকছে না বিদ্যুৎ। এতে জনজীবনে বাড়ছে দুর্ভোগ। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবীরা। কাঠফাটা রোদে তীব্র গরম। পুড়ছে শহর-গ্রামের প্রতিটি প্রান্তর। গরমের সঙ্গে পাল্টা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। নগরকেন্দ্রিক সহনীয় থাকলেও ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে প্রান্ত শ্রেণির মানুষকে। বন্ধ থাকছে কলকারখানা, ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে জেলার শিল্পখাতেও। সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরীর ৪২টি কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিস সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে, যা আগে ছিল বিকাল ৫টা পর্যন্ত।

একইভাবে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমও নতুন সময়সূচির আওতায় আনা হয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন থেকে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত লেনদেন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করে ব্যাংকগুলো বিকাল ৪টায় বন্ধ হবে। এ ছাড়া দেশের সব মার্কেট, দোকানপাট ও শপিংমল সন্ধ্যা ৬টার পর বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান এবং খাবারের দোকানের মতো জরুরি সেবাসমূহ এই নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ নির্দেশনা কঠোরভাবে মনিটর করা হবে এবং নির্ধারিত সময়সূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়রা জানান, গত কয়েকদিন ধরে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় প্রচণ্ড গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

অনেকে ঠিকমতো ঘুমাতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাতক্ষীরা শহরের কলেজ রোড এলাকার ভ্যানচালক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “গরমে ভ্যান চালানোই কষ্টকর, তার ওপর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে আয়ও কমে গেছে।” রাজার বাগান এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের জানান, শুক্রুবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ৫ বার বিদ্যুৎ গেছে। প্রতিবার দীর্ঘ সময় পর বিদ্যুৎ ফিরে আসে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

পলাশপোল এলাকার অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন বলেন, “তীব্র গরমে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিংয়ে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে।” আসন্ন এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। আশাশুনির দরগাহপুর গ্রামের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, এতে পরীক্ষার প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিন ও রাতে কয়েকবার বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে অনেক এলাকায়। তীব্র তাপদাহে শিশু ও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সাতক্ষীরা বিসিক শিল্পনগরীর উপ-ব্যবস্থাপক গৌরব দাশ বলেন, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো অর্ডার সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সাতক্ষীরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চ.দা.) মুহাঃ আজিজুর রহমান সরকার জানান, জেলায় ৬ লাখ ৪৭ হাজার গ্রাহকের বিপরীতে চাহিদা ১১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ, কিন্তু সরবরাহ মিলছে মাত্র ৭৫ মেগাওয়াট। ফলে ৩৭ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। ওজোপাডিকো সাতক্ষীরা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শহরের ৫৫ হাজার গ্রাহকের চাহিদা ১৯ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ১৫ মেগাওয়াট। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ঘাটতির কারণে পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তারা আরও জানান, শহরের ১১টি ফিডারের মাধ্যমে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এদিকে, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সব প্রতিষ্ঠানের জন্য ১২টি জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে সরকার।

১. দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার পরিহার করতে হবে এবং জানালা ও দরজা কিংবা ব্লাইন্ড খোলা রেখে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

২. বিদ্যমান ব্যবহৃত আলোর অর্ধেক ব্যবহার করতে হবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইটের ব্যবহার পরিহার করতে হবে।

৩. অফিস চলাকালীন প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হবে।

৪. এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা অবশ্যই ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার উপরে রাখতে হবে।

৫. অফিস কক্ষ ত্যাগ করার সময় কক্ষের বাতি, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ সব বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে।

৬. অফিসের করিডোর, সিঁড়ি, ওয়াশরুম ইত্যাদি স্থানে অপ্রয়োজনীয় বাতি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।

৭. বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে।

৮. অফিস সময় শেষ হওয়ার পর সব বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি যেমন: লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার ও এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে।

৯. যাবতীয় আলোকসজ্জা পরিহার করতে হবে।

১০. সরকারি গাড়ির ব্যবহার সীমিত করতে হবে।

১১. জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ী ও মিতব্যয়ী হতে হবে।

১২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।