আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা-৪ আসনে রাজনৈতিক তৎপরতা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। শ্যামনগর উপজেলাজুড়ে দলীয় প্রস্তুতি, গণসংযোগ ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে সরব হয়ে উঠেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ধারাবাহিক ও সংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।
নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদিনই গাজী নজরুল ইসলাম উপজেলার বিভিন্ন ওয়ার্ড, গ্রাম ও প্রত্যন্ত জনপদে উঠান বৈঠক, মতবিনিময় সভা, গণসংযোগ, কর্মী সমাবেশ ও জনসভায় অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে কেন্দ্রভিত্তিক প্রস্তুতি, পোলিং এজেন্ট প্রশিক্ষণ ও সুপরিকল্পিত কর্মসূচির মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীরাও মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছেন। এতে করে নির্বাচনী প্রস্তুতিতে জামায়াতে ইসলামীকে সুসংগঠিত ও অগ্রসর অবস্থানে দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে—বর্তমানে মাঠে আওয়ামী লীগের কোনো দৃশ্যমান সাংগঠনিক তৎপরতা নেই এবং জাতীয় পার্টির কার্যক্রমও সীমিত। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সাতক্ষীরা-৪ আসনে মূল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপিকে কেন্দ্র করে।
গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভোট লাভ করেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিক সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতার কারণে তিনি নির্বাচনী দৌড়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
দৈনিক সংগ্রামের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে গাজী নজরুল ইসলাম তার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রচিন্তাভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শ্যামনগর একটি উপকূলীয় জনপদ হওয়ায় এখানকার মানুষের জীবন ও জীবিকা বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়ে। এ বাস্তবতায় নির্বাচিত হলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই হবে তার প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়ীবাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সুন্দরবনভিত্তিক পর্যটন শিল্প বিকাশের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি হানি প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন, উপকূলীয় কৃষি ও মৎস্যসম্পদ রপ্তানিমুখী করার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে মুন্সীগঞ্জ-কলাগাছিয়া সংযোগে চুনা নদীর ওপর দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ নির্মাণ করে সুন্দরবনের ভিতরে রোপওয়ে, নীলডুমুর এলাকায় মিনি হেলিপ্যাড নির্মাণ এবং বিভিন্ন নদী খাল পুনঃখননের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে ফেরিঘাট, সড়ক ও নৌ যোগাযোগ উন্নয়নের মাধ্যমে কয়রা হয়ে খুলনার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করেন।
দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, যুবসমাজকে দক্ষ করে তুলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন সম্ভব। চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরার মাধ্যমে স্বাবলম্বী শ্যামনগর গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
স্বাস্থ্যখাত উন্নয়ন প্রসঙ্গে গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্য থাকাকালীন তিনি শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেছিলেন। বর্তমানে এই হাসপাতালকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করে আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
তার মতে, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার জন্য নয়; মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রকৃত রাজনীতির লক্ষ্য। মাদকমুক্ত সমাজ গঠন, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং নৈতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই তিনি নির্বাচনী মাঠে কাজ করছেন।
অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে এই আসনে প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছেন ড. মনিরুজ্জামান। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সংগঠিত প্রচারণা ও নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে তারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে চায়। ইতোমধ্যে তিনিও মাঠপর্যায়ে গণসংযোগ শুরু করেছেন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা-৪ আসনে নির্বাচনী উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে। ধারাবাহিক গণসংযোগ, সুস্পষ্ট উন্নয়ন রূপরেখা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে দৃশ্যমান অবস্থানে রয়েছেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।