স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কাশিমপুরের ধনঞ্জয়খালী এলাকায় নির্মাণাধীন সড়ক উদ্বোধনের আগেই ধসে পড়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তাৎক্ষণিক নির্দেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

পরিদর্শনকালে তিনি সড়কের নির্মাণমান, ব্যবহৃত উপকরণ এবং ভূপ্রকৃতিগত বাস্তবতা সরেজমিনে যাচাই করেন। প্রাথমিক তদন্তে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক কারণ-উভয় বিষয়ই সামনে এসেছে বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ এবং প্রকৌশলী শামসুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পরিদর্শন শেষে প্রতিমন্ত্রী গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শওকত হোসেন সরকারের কাছে বরখাস্ত সংক্রান্ত চিঠি হস্তান্তর করেন।

gazipur-roadslide-

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, 'উদ্বোধনের আগেই একটি সড়ক ধসে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। জনগণের অর্থে নির্মিত কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা গাফিলতির সুযোগ নেই। প্রাথমিকভাবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তে যারা দায়ী প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'

তিনি আরও জানান, পূর্বে গঠিত সকল তদন্ত কমিটি বাতিল করে ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিত দেন তিনি।

অভিযুক্তদের পক্ষ থেকেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ বলেন, 'প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত মান বজায় রেখেই বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক কারণও এ ধরনের ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি।'

অন্যদিকে প্রকৌশলী শামসুর রহমান বলেন, “এটি একটি প্রাকৃতিক জনিত ঘটনা। কাজ চলমান থাকার সময় আমি ওই স্থানে দায়িত্বে ছিলাম না। তারপরও তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে আশা করি।'

ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, সড়কের যে অংশে ধস নেমেছে সেখানে অতীতে একটি পুরনো মন্দির ছিল-যা নিয়ে কুসংস্কারভিত্তিক নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি ‘পাঠা বলি’ দেওয়ার কথাও শোনা যায়।

তবে অধিকাংশ সচেতন স্থানীয়রা এসব ধারণা নাকচ করে প্রকৌশলগত ত্রুটিকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, ধসে পড়া অংশের মাটির গঠন ছিল দুর্বল এবং সেখানে আরও গভীর পাইলিং ও শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল। শুধু তাই নয়, ধসের বিপরীত পাশে নদীর অপর প্রান্তেও একই ধরনের মাটি দেবে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে, যা পুরো এলাকার ভূপ্রকৃতিগত ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

স্থানীয়দের ভাষায়, 'এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পুরো এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। সঠিকভাবে সার্ভে, মাটি পরীক্ষা এবং শক্ত ভিত্তি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।'

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা কেবল একটি সড়ক ধস নয়-এটি উন্নয়ন কার্যক্রমের মাননিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও জবাবদিহিতার একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। তারা বলছেন, প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, স্বচ্ছতা এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত না করলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে। একই সঙ্গে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অনিয়ম কমবে এবং জনআস্থা ফিরে আসবে।

ঘটনাটি এখন শুধু একটি নির্মাণ ত্রুটির সীমায় নেই-এটি পুরো উন্নয়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনই নির্ধারণ করবে, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা, নাকি অব্যবস্থাপনার গভীর সংকেত।