খুলনা বিভাগে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব। গত কয়েকদিনে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। ইতোমধ্যে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ শিশু গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া বিভাগের ১০ জেলায় ৭৮ শিশু চিকিৎসাধীন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতা জোরদার করার পাশাপাশি শিশুদের টিকাদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন চিকিৎসকরা।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তিনজন শিশু গুরুতর অবস্থায় আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি রয়েছে। ৮ মাস, ৭ মাস এবং ৫ মাস বয়সি এই তিন শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ফেইল করায় তাদের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছে শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সৈয়দা রুখসানা পারভীন। এছাড়া খুলনা বিভাগের সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে ১৩ এবং কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশনে আরও ৫০ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া যশোরে ৬, সাতক্ষীরা ও ঝিনাইদহ ও মাগুরায় ২ জন করে শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে সব থেকে বেশি আক্রান্ত হয়েছে নবজাতক থেকে ৬ মাসের মধ্যে। ৬ মাসের কম বয়সি ৪ জন, ৬ থেকে ৯ মাস বয়সি ৭ জন, ৯ থেকে ১১ মাস ৪ জন, ১ বছর থেকে ৪ বছরের মধ্যে ৬ জন, ৫ বছর থেকে ৯ বছর এর মধ্যে ২ জন, এছাড়া ২০ বছরের নীচে ৩ জনের শরীরে এই হাম আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে উচ্চ জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিচ্ছে, যার কারণে কিছু শিশুকে আইসোলেশন ইউনিটে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজনকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সৈয়েদা রুখসানা পারভীন বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশু হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যে-সব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। তিনি আরও বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ অন্যান্য হাসপাতালে হামসহ সংক্রামক রোগে আক্রান্তদের ভর্তি করা হয় না। কিন্তু এই রোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ও খুলনায় যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি রয়েছে, তার সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আমাদের এখানে (খুমেক হাসপাতলে) নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটি আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করে সেখানে তিনটি শিশুকে রাখা হয়েছে। কিন্তু তিনটি শিশুর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এই মুহূর্তে সরকারের ব্যাপকভাবে একটি ভ্যাকসিনেশন ব্যবস্থা চালু করা দরকার।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. মুজিবুর রহমান জানান, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে এবং বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হামের চিকিৎসার জন্য বিশেষ নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি বিভাগের পাশে পৃথক ‘হাম কর্ণার’ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে চারজন শিশুকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে তিনজনের বয়স এক বছরের কম এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। নতুন রোগী এলে প্রয়োজন অনুযায়ী মীরের ডাঙ্গা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করা হবে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে হাম থেকে সুস্থ হওয়া সম্ভব। তাই অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লায় হামের প্রকোপ বৃদ্ধি, ঢাকায় চিকিৎসাধীন ৩ শিশুর মৃত্যু

কুমিল্লা অফিস: কুমিল্লায় হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির জানিয়েছেন, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২১ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

এদিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর শিশু বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে হাম আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হয়েছে। শিশুদের স্বজনদের মাঝে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

হাসপাতালটির শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. মিয়া মনজুর আহমেদ বলেন, হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আলাদা একটি ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। গত ১৮ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮ জন চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে, ২ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করা হয়েছে এবং বর্তমানে ১৫ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে।

তিনি আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।