নির্বাচন ডেস্ক
জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ইশতেহার হলো একটি লিখিত নীতিপত্র। নির্বাচিত হলে তারা কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এতে তার রূপরেখা থাকে। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা চালু হয় যেন ভোটাররা প্রতিশ্রুতি ও নীতির ভিত্তিতে দল বেছে নিতে পারে।
এবারের নির্বাচনে অনেকগুলো দল অংশ নিলেও নির্বাচনে মূলত প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা হচ্ছে মূলত জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তাই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে হচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং বাস্তবতার নিরিখে কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য তা পর্যালোচনা করছেন অনেকে। তবে এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে জামায়াত ও বিএনপির ইশতেহার ছাড়াও তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির ইশতেহার নিয়েও রয়েছে মানুষের আগ্রহ। আর তাই দলগুলোর ইশতেহারে শিক্ষা, অর্থনীতি, নারীর অধিকার ধর্মীয় স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে প্রস্তাবনাসহ প্রতিশ্রুতির দিকগুলোগুলো রয়েছে আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
প্রথমেই শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করলে শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে জামায়াত শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং মানবিক সমাজ গঠনের কথা বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ছয় শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক চরিত্র গঠনের বিষয়টি তাদের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি শিক্ষা খাতে জিডিপির একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (৫ শতাংশ) বরাদ্দের লক্ষ্য এবং কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে- বিএনপি শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নয়ন ও প্রযুক্তির হাতিয়ার হিসেবে দেখে আর জামায়াত দেখে দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক চরিত্র গঠনের মাধ্যম হিসেবে। অন্যদিকে, এনসিপি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠন, শিক্ষকদের পৃথক বেতন কাঠামো ,স্নাতক পর্যায়ে ছয় মাসের পূর্ণকালীন ইন্টার্নশিপ ও প্রবাসী গবেষকদের দেশে ফেরাতে ফান্ডিং প্রদানের কথা প্রতিশ্রুতি তাদের ইশতেহারে তুলে ধরেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি বিষয় আলাদা করে চোখে পড়েছে। জামায়াতের ইশতেহারে শোষণমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পূর্বশর্ত হিসেবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সুশাসন, দুর্নীতি রোধ ও ন্যায্য বণ্টন। এখানে বড় ব্যয় পরিকল্পনার চেয়ে শাসনপদ্ধতির স্বচ্ছতা ও কাঠামোগত শৃঙ্খলার ওপর জোর বেশি।
অন্যদিকে ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনবল নিয়োগের মতো খাতে বড় আকারের ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। যা রাষ্ট্রনির্ভর ব্যয় সম্প্রসারণ মডেলের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই সেবা ও অবকাঠামো বাড়িয়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার কথা বলা হয়েছে।
নারীদের নিয়ে জামায়াত তাদের ইশতেহারে বলেছে দলটি ক্ষমতায় আসলে নারীদের সম্মান রক্ষা করে নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সেই সাথে মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে কর্মঘণ্টা পাঁচ এ নামিয়ে আনা হবে। এছাড়া নারী শিক্ষার উন্নয়নে স্নাতক পর্যন্ত নারীরা বিনা বেতনে পড়াশোনার ব্যবস্থার কথা তুলে ধরা হয়েছে। উত্তরাধিকারসহ পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। জামায়াতের ন্যায় বিএনপিও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেছে তাদের ইশতেহারে। এছাড়া সবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি চালু করার পরিকল্পনা আছে তাদের। বিএনপির ইশতেহারে দেশের প্রতিটি পরিবারের নারী সদস্যের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এর কথা বলা হয়েছে। তবে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বিপুল অঙ্কের টাকা রাষ্ট্র কোথা থেকে জোগাড় করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে, পাশাপাশি এটি বাস্তবায়ন করা কতটুকু সম্ভব হবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অন্যদিকে এনসিপির ইশতেহারে নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পূর্ণ বেতনে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ও এক মাস পিতৃত্বকালীন ছুটি বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মক্ষেত্রে ঐচ্ছিক পিরিয়ড লিভ ও ডে-কেয়ার সুবিধা ও নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসামগ্রী সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরবরাহ করার কথা বলা হয়েছে।
অতীতে আমরা দেখেছি যে, ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ খামখেয়ালী আচরণ করেছে। নতুন বাংলাদেশে মানুষ মর্যাদার সাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। নির্বাচনী ইশতেহার তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী বছরগুলোতে দেশের দায়িত্ব কোনো দলের হাতে তুলে দেওয়ার আগে মানুষ অবশ্যই তার ইশতেহারের বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে।