‘আজ ডাকাতে ধরেছে, কাল বাঘে ধরবে পরশু কুমিরে’ এভাবেই সুন্দরবনে অবৈধ প্রবেশকারীদের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন খুলনা-অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ। সম্প্রতি সুন্দরবন থেকে উদ্ধারকৃত বাঘের সর্বশেষ অবস্থা সংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
সম্প্রতি সুন্দরবনে ঘুরতে বেরিয়ে বনদস্যু বাহিনীর হাতে ইকো রিসোর্ট মালিক ও ২ নারীসহ ৭ পর্যটকের পণবন্দী হওয়া প্রসঙ্গ এনে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশে নীতিমালা আছে। যথানিয়মে পর্যটকরা বনে প্রবেশ করলে তাদের সশস্ত্র বনরক্ষী দিয়ে পাহারা দিয়ে বনে বেড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা রিসোর্টগুলোতে থাকা পর্যটকদের সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ছোট ছোট নৌকায় করে কোন ধরনের নিরাপত্তারক্ষী ছাড়াই সুন্দরবনের ভিতরে নিয়ে ঘোরানো হয়। ফলে ডাকাতরা সহজেই তাদের পণবন্দী করার সুযোগ পায়। আর এভাবে অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে শুধু ডাকাত কেন বাঘ বা কুমিরের আক্রমণের মুখেও পড়তে পারেন পর্যটকরা। এ বিষয়ে পর্যটকদের সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন এই বন কর্মকর্তা।
এদিকে, সুন্দরবনে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে কমপক্ষে ২০টি বনদস্যু বাহিনী। তারা পর্যটক ও জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। এমনকি মাছ ও অর্থও লুট করছে। ফলে শান্ত বন নতুন করে অশান্ত হয়ে উঠছে।
জানা গেছে, সুন্দরবনের গোলকানন রিসোর্ট থেকে গত শুক্রবার বিকেলে কানুরখোলা খালে কাঠের বোটে ভ্রমণে বেরহন পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকসহ সাতজন। আকস্মিক তারা অপহরণের শিকার হন। দস্যু মাসুম মৃধার নেতৃত্বে একটি বাহিনী তাদের অপহরণ করে বনের ভেতর নিয়ে যায়। পরে তিন পর্যটক ও মাঝিকে মুক্তি দিয়ে দুই পর্যটক ও রিসোর্ট মালিককে বনের অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণের দুই দিন পর গত রোববার কোস্ট গার্ড ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন বনজীবী, পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকরা। শুধু এ ঘটনাই নয়, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে দীর্ঘদিন পর আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুরা। অহরহ ঘটছে জেলে-বাওয়ালিদের জিম্মি ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা। অস্ত্রের মুখে জিম্মিকরে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে সবকিছু। ফলে ভয় আর আতঙ্কে অনেকেই এখন বনেই যেতে চায় না। বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় জেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনে এক সময়ে ত্রাস সৃষ্টি করে জলদস্যুরা। অপহরণ, দস্যুতাসহ নানা অপরাধের অভয়ারণ্য ছিল এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। জেলে, বাওয়ালি থেকে শুরু করে পর্যটকরাও সবসময় থাকতেন ভয়ে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩২টি বাহিনীর প্রধানসহ ৩২৮ দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করে। বনদস্যুদের আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে বনদস্যুদের তৎপরতা অনেকটাই কমে আসে। গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জেলপলাতক অনেক দাগী আসামি সুন্দরবনে আশ্রয় নেয়। এ ছাড়াও দস্যুতায় ফিরে আসে আত্মসমর্পণকারীদের অনেকে। তারা সংগঠিত হয়ে বাহিনী গড়ে তুলে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি সাতক্ষীরা রেঞ্জে মজনু বাহিনী, আলিফ মোল্ল বাহিনী, মেহেদী হাসান মিলন বাহিনী, রবিউল ইসলাম বাহিনী, জিয়া বাহিনী, ফজলু বাহিনী, মাসুম বাহিনী, আব্দুল্লাহ বাহিনী, রবিউল বাহিনী, জাকির বাহিনী, রেজাউল বাহিনী এবং খুলনা রেঞ্জে রবিউল (মাস্টার বাহিনী), খানজেয়া বাহিনী, বিলাল বাহিনী, আমিনুর বাহিনী, জিল্লুর বাহিনী, রশিদ বাহিনী, আসাবুর বাহিনী, দয়াল বাহিনী ও আলিম-মিলন পাটোয়ারী-রবিউল বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। এ সব দস্যুবাহিনী সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা, ঢাংমারি ও রামপাল এলাকা।
খুলনা জেলার দাকোপ ও কয়রা এলাকার কয়েকটি পয়েন্টে উল্লেখ্যযোগ্য দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। তাদের সদস্যরা বাটলু নদী, চরামেঘনা খাল, ফিরিঙ্গী নদী, হাতিভাঙ্গা খাল, কেওড়াতলী খাল, চালতামারী খাল, লম্বাখালী খাল, তক্তাখালী খাল, সুপদি-গুবদি খাল, বাগদী খাল, মানিকচোরা খাল, খেজুনাদানা খাল, ইলসেমারী খাল, মাজুর নদী খাল, আশাশুনি, জলঘাটা খাল, তালতলি খাল, মাইট্টার কিনারা, খলসিবুনিয়া খাল, কলাগাছিয়া নদী, আঠারোবাকী খাল, দাড়গাঙ খাল, সাচানাংলা, জয়মনি খাল এলাকা, খলসিবুনিয়া খালের মুখ, হংসরাজ নদীর মুখ, নিশানাখালী, কালির খাল, বেলমারী, মামার খাল, শরবতখালী খালের সংলগ্ন কাচিকাটা খাল, দুধমুখ খাল, মান্দার খাল, কবর খালী খাল (সংকদ্বীপ), অলকির চর, পাটাকাটা, কুকুমারী, কালাবগীর খাল, কুদিখালী খাল, বানতলা খাল, হাড্ডেরা খাল, ঝনঝনিয়া খাল, লাউবুড়ুনিয়া খাল, বড় হলদি, ছোট হলদি, মানিকের খাল, ভদ্রা বিভিন্ন খাল, বিদ্যার নদী, হেলা, ঝালিয়া খাল, আন্ধারমানিক, আড়পাঙ্গাশে, ঝাঁলে, পাটকোস্টা, ভ্রমরখালী, আড়োশিবসা, মান্ধারবাড়ি, জাবা ও হংসরাজ নামক খাল ও নদীতে প্রতিনিয়ত অহরহ দস্যুতা সংঘটন করছে।
সুন্দরবনের জেলে আল আমিনসহ কয়েকজন জানান, প্রায় প্রত্যেক জেলেকে অপহরণ ও জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে দস্যুরা। জেলেদের কাছ থেকে মাছ, টাকা, মোবাইলফোনসহ সবকিছু কেড়ে নিচ্ছে তারা। টাকা দিতে না পারলে আটকে রেখে নির্যাতনও করা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বাটলুর খাল থেকে মিজান ও আলমগীরসহ ৯ জেলেকে অপহরণ করে দস্যুরা। পরে মাথাপিছু ২ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দিয়ে তারা ফিরে এসেছেন।
সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুম আলী ফকির বলেন, তার ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা চলে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরে। সম্প্রতি অনেক দস্যুবাহিনী বনে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের হাতে ইউনিয়নের অনেক জেলে অপহৃত হয়েছেন। পরে দস্যুদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে নৌকাপ্রতি খরচসহ ২০ হাজার ৪০০ টাকা দিয়ে মুক্তি মিলেছে। এখন ভয়ে কেউ বনে যেতে চাচ্ছে না। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলে-বনজীবী ও তাদের পরিবার।
এদিকে, সুন্দরবনের আশপাশে অবৈধভাবে কমপক্ষে ৪০টি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ এবং বানিশান্তা ইউনিয়নে এগুলোর অবস্থান। এসব রিসোর্টে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসছেন, যারা বনভূমির কাছাকাছি এলাকার কোনো একটি রিসোর্টে থেকে বনের ভেতরে প্রবেশ করছেন। গত শুক্রবার বিকেলে কানুরখোলা খালে পাঁচ পর্যটক, রিসোর্ট মালিক ও মাঝি অপহরণের ঘটনার পর পর্যটক ও রিসোর্ট মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। আগে জেলে ও বাওয়ালি অপহরণ হলেও পর্যটক অপহরণের ঘটনা এবারই প্রথম।
মাঞ্জারুল ইসলামসহ কয়েকজন পর্যটক জানান, শীতের মওসুমে পরিবার নিয়ে সুন্দরবনের রিসোর্টে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অপহরণের ঘটনার পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। পরিবার নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না।
অন্যদিকে, গত শনিবার দুপুরে সুন্দরবনপূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার বৈদ্যমারী ও জয়মনি বাজারের মাঝামাঝি শরকির খালের কাছেই হরিণ শিকারের ফাঁদে একটি বাঘ আটকে পড়ে। পরে ট্রানকুইলাইজার গান দিয়ে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করে বাঘটিকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয়। শুধু এ ঘটনাই নয় ইদানীং সুন্দরবনে হরিণ শিকারীদের তৎপরতা বেড়েছে। নিয়মিত অভিযানে প্রায় হরিণের গোশত ও ফাঁদসহ সরঞ্জাম উদ্ধার হচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত বছর সুন্দরবন থেকে ১ হাজার ৬৩০ কেজি হরিণের গোশত উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ২১৮ কেজি, ফেব্রুয়ারিতে ৬২ কেজি, মার্চে ৩৩৭ কেজি, এপ্রিলে ২৭৪ কেজি, মে মাসে ১১১ কেজি ৬০ গ্রাম, জুনে ২০ কেজি ৫০০ গ্রাম, জুলাইয়ে ১০ কেজি, আগস্টে ৩২ কেজি, সেপ্টেম্বরে ১৬৫ কেজি, অক্টোবরে ৯৩ কেজি, নভেম্বরে ১৬৫ কেজি এবং ডিসেম্বরে ১৪২ কেজি গোশত উদ্ধার করা হয়।
বাগেরহাটের মোংলার কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান বলেন, আমরা গত এক বছরে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলী, দেশীয় অস্ত্রসহ অন্তত ৪২ ডাকাত দলের সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছি। এর মধ্যে কয়েকটি বাহিনীর প্রধানকেও গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বনের ওপর নির্ভরশীল বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুন্দরবনের ডাকাতদের বিরুদ্ধে কোস্ট গার্ড জিরো টলারেন্সে রয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বনসংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, বনদস্যু দমনে কাজ করে কোস্ট গার্ড, র্যাব ও নৌপুলিশ। বনদস্যু নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বন বিভাগের নেই। তবে বন বিভাগ বন ও বনের প্রাণী রক্ষায় কাজ করছে। হরিণ শিকার রোধে আগে নৌকায় টহল দেওয়া হত। তবে এখন বনের ভেতর হেঁটে টহল দেওয়া হচ্ছে। টহলে অসংখ্য ফাঁদ উদ্ধার হচ্ছে।
দস্যুনিয়ন্ত্রণে র্যাব-৬ খুলনার অধিনায়ক নিস্তার আহমেদ বলেন, সুন্দরবনের স্থলভাগে কোনো দস্যুর তৎপরতা লক্ষ্য করা গেলে র্যাব তাদের গ্রেফতার করছে। গত রোববার পর্যটক ও রিসোর্টের মালিক অপহরণের ঘটনায় ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে বিশেষ অভিযান ছাড়া জলভাগে র্যাব যায় না। জলভাগে কোস্ট গার্ড দস্যুতা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
জোনাল কমান্ডার কোস্ট গার্ড পশ্চিম-জোনের ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে অপরাধ নির্মূলে ডাকাত ও জলদস্যু বিরোধী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত বছর অভিযান পরিচালনা করে ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২টি হাতবোমা, ৭৪টি দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জামাদি, ৪৪৮ রাউণ্ড কার্তুজ এবং দস্যুদের কাছে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৯ ডাকাত আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।