খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক অবনতি ঘটেছে। টানা সহিংসতায় নগরজুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার আবহ। গত মাত্র ১০ দিনে অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রকাশ্যে গুলী ও ধারালো অস্ত্রের হামলায় প্রাণহানির এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তীব্র হয়ে উঠেছে। একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে অনেকের কাছেই খুলনা এখন আতঙ্কের নগরী হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে এ নগরীতে ৬০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার শিকার হচ্ছেন নারী ও শিশুরাও। ফলে নগরবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা বলছেন, একাধিক সন্ত্রাসী চক্রের উত্থান, পারিবারিক বিরোধ, মাদক ব্যবসা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। প্রকাশ্যে গুলী চালানো কিংবা কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। অপরাধীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে নগরবাসী আতঙ্কিত। অনেকেই বলছেন, খুলনা ধীরে ধীরে ‘খুনের নগরীতে’ পরিণত হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, খুলনার মানুষ এখন শুধু রাতের অন্ধকারে নয়, দিনের আলোতেও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও নিরাপত্তা নেই। শহরজুড়ে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। খুন, হামলা, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা বাড়তেই থাকায় মানুষের মনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ্যে অপরাধ সংঘটিত হলেও তা দমনে পুলিশের দৃশ্যমান কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

পুলিশের সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কুপিয়ে ও গুলী করে হত্যার পাশাপাশি গত দেড় বছরে খুলনা অঞ্চলের নদ-নদী থেকে প্রায় অর্ধশত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ১১টি শিশু। উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে ২০ জনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সবশেষ বুধবার (৪ মার্চ) রাত ৯টার দিকে খুলনা মহানগরীর ব্যস্ততম ডাকবাংলো মোড়ের একটি বাটা শোরুমের ভেতরে প্রকাশ্যে গুলী ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি এবং রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মীনা মাসুম বিল্লাহকে। ঈদের কেনাকাটা করতে এসে পরিবারের সদস্যদের সামনেই নৃশংসভাবে খুন হন তিনি। ঘটনার পর ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক মাহমুদ আলমের তাৎক্ষণিক সাহসী ভূমিকায় স্থানীয় জনতার সহায়তায় সন্ত্রাসী অশোক ঘোষকে একটি বিদেশি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

ডাকবাংলো মোড়ে এই হত্যাকাণ্ডের দেড় ঘণ্টা পরই রাত সাড়ে ১০টার দিকে মহানগরীর লবণচরা এলাকার মুজাহিদপাড়া এলাকায় আরেকটি গুলীবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। গুলীবিদ্ধ যুবকের নাম হাবিবুর রহমান। পুলিশ জানায়, দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার একপর্যায়ে ছোড়া গুলী লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার শরীরে লাগে। আহত হাবিব সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদের ছেলে। তিনি পেশায় রিকশাচালক।

এর আগে গত সোমবার (২ মার্চ) রাত পৌণে ১০টার দিকে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন খুলনা সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল নেতা সাব্বির। নগরীর টুটপাড়া দরবেশ মোল্লা গলির সামনে এ ঘটনা ঘটে। সাব্বির মুজাহিদ সড়ক এলাকার বাসিন্দা শাহ আলমের ছেলে।

আগেরদিন রোববার (১ মার্চ) রাত ৯টার দিকে খুলনা মহানগরীর নিরালা মোড়ের জাহিদুর রহমান ক্রস রোড এলাকায় সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে আজিজ (৩৫) নামে এক যুবককে গুলী ও কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে তাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে মৃত্যু হয়। নিহত আজিজ বাগমারা মেইন রোড ব্রিজ এলাকার বাসিন্দা খলিলের ছেলে। তারও আগে গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে খুলনায় যুবদল নেতা মুরাদ খানকে (৪৫) দুই পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। তিনি দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। সেনহাটি বক্সীবাড়ি কবরস্থানের সামনে দুর্বৃত্তরা তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। নিহত মুরাদ উপজেলার হাজীগ্রাম এলাকার খান মুনসুর আলীর ছেলে।

আগের দিন বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে মহানগরীর খানজাহান আলী থানাধীন আফিল গেট এলাকায় সোহেল (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা পরপর কয়েকটি গুলী করে হত্যা করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, খুলনা মহানগরীতে আশিক, নূর আজিম, হুমা, গ্রেনেড বাবুসহ অন্তত ৮ থেকে ১০টি সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেনেড বাবু ও পলাশ গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। তাদের দ্বন্দ্বের জেরেই খুলনায় বহু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নাগরিক সমাজের নেতারা বলছেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে বেড়েছে খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধ। দুর্বৃত্তরা এখন শুধু পথে-ঘাটে নয়, বাসাবাড়িতেও হামলা চালাচ্ছে। এমনকি ঈদবাজারের ভিড়ের মধ্যেও হাজারো মানুষের সামনে খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। ফলে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। জনসমাগমপূর্ণ এলাকাতেও যখন এ ধরনের ফৌজদারি অপরাধ ঘটছে, তখন সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আরও বাড়ছে। অনেকের মতে, অপরাধীরা এখন কাউকেই তোয়াক্কা করছে না; বরং দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাদের অভিযোগ, পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস করবে না।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা এখন খুনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বুধবার রাতে ডাকবাংলো মোড়ে জনসম্মুখে যেভাবে শ্রমিক দলের নেতা মাসুম বিল্লাহকে হত্যা করা হয়েছে, তা যেন চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো। আগে ভাবতাম দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এখন নির্বাচিত সরকারের সময়েও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিদিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুলনার মানুষের মনে এখন হতাশা ও আতঙ্ক ছাড়া কিছুই নেই। খুলনা যেন সন্ত্রাসীদের মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের উদাসীনতা, সক্রিয়তার ঘাটতি, পেশাদারিত্বের অভাব; নাকি ভেতরেই কোনো দুর্বলতা রয়েছে, যার কারণে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও সন্ত্রাসীরা পার পেয়ে যাচ্ছে; এ প্রশ্ন এখন মানুষের মনে জোরালো হচ্ছে।

এ ব্যাপারে খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের জন্য সব থানার ওসি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করছি।