খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপালে নৌবাহিনীর স্টাফ বাস ও বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর–কনে ও জমজ শিশুসহ নিহত বেড়ে ১৪ জন দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে খুলনা–মোংলা মহাসড়কের বেলাইব্রিজ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।

মোংলা পোর্ট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আঃ রাজ্জাক তার ৫ ছেলের ছোট ছেলে সাব্বিরকে বিয়ে করাতে বুধবার রাতে খুলনার কয়রায় যান বিএনপি নেতা আ: রাজ্জাক। রাতেই ছেলের বিয়ে সম্পন্ন সেখানে। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা হন রাজ্জাক ও তার পরবিারের সদস্যরা। তার সাথে ছিলেন ছেলে জনি, আব্দুল্লাহ, আলআমিন ও এক মাত্র মেয়ে ঐশি। তিন ছেলের স্ত্রী, মেয়ে, মেয়ে জামাই ও তাদের নাতি-নাতনীসহ ১৫ জন যাত্রী মাইক্রোতেই ছিলেন। পরিবার নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে বাগেরহাটের মোংলা-খুলনা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার গুনাই ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় তাদের মাইক্রোবাসটি পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর বাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

এতে ঘটনাস্থলে মারা যায় বিএনপি নেতা রাজ্জাকসহ পরিবারের ১৪ জন। এদের মধ্যে দুইজন জমজ শিশু বাচ্চাও রয়েছে। এছাড়া মারা যায় মাইক্রোবাসের চালকও। মাইক্রোবাসের চালক নাঈমের বাড়ী বাগেরহাটের রামপালে এলাকায়।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন—মোংলা পৌর বিএনপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক (৬২), আহাদুর রহমান সাব্বির (৩০), আব্দুল্লাহ সানি (৩০), ঐশি (২৮), ফাহিম শিকারি (১), ফারহানা সিদ্দিকা (৩৩), আলিফ (১৩), আরফা (৭), আয়রা (২), আনোয়ারা বেগম (৫৮), মার্জিয়া আক্তার মিতু (২৫), মিনারুল আলম সবুজ (৪২) এবং মাইক্রোবাসের চালক মো. নাইম হোসাইন (২৭)। নিহতদের মধ্যে নববধূ মিতু খুলনার কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামের ছালাম মোড়লের মেয়ে।

বাগেরহাটের রামপাল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) সুব্রত মন্ডল জানান, ঘটনাস্থল থেকে ৪টি লাশ নেয়া হয় রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয় ১০জনের লাশ। আর একজন গুরুতর আহত অবস্থায় খুলনা মেডিকেলে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এ ঘটনায় সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে এসেছেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ স্থানীয় প্রশাসনের সকল কর্মকর্তারা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মোংলা থেকে ছেড়ে আসা নৌবাহিনীর স্টাফ বাসটি রামপালের বেলাইব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে বিয়ে বাড়ি আসা মোংলাগামী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই কয়েকজন নিহত হন।

নিহত কনে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) মামা আবু তাহের জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনার কয়রা উপজেলার নাকশা এলাকায় আমার ভাগ্নি মার্জিয়ার সাথে মোংলা পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের শেলাবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা আ. রাজ্জাকের ছেলে সাব্বিরের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের পর বরযাত্রীদের নিয়ে মাইক্রোবাসটি মার্জিয়ার শ্বশুরবাড়ি থেকে মোংলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথে রামপালে পৌছালে এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। এতে মার্জিয়া, তার বোন লামিয়া ও নানী নিহত হয়েছেন। এছাড়া বরের সঙ্গে আরও ১১ জন মারা গেছেন।

কাটাখালী হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) কে এম হাসানুজ্জামান জানান, নৌবাহিনীর যাত্রীবাহী বাসটি খুলনার দিকে যাচ্ছিল আর মাইক্রোবাসটি ছিল মোংলাগামী। পথিমধ্যে বেলাইব্রিজ এলাকায় দুটি যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে মাইক্রোবাসটি দুমড়েমুচড়ে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। হতাহতদের উদ্ধার করে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুকান্ত কুমার পাল জানান, দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের মরদেহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। আহত কয়েকজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক মেহেনাজ মোশাররফ জানান, এ পর্যন্ত আমাদের এখানে ১০ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন শিশু, তিনজন নারী ও ৪ জন পুরুষ।

বিএনপি নেতার পরিবারসহ নিহতের ঘটনায় সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিষয়টি নিশ্চিত করে বাগেরহাটের মোংলা-রামপাল সংসদীয় আসন-৩ এর এমপি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, খবর শুনে প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানিয়েছেন এবং পরিবারের পাশে থেকে সকল ব্যবস্থাপনা সম্পন্নের জন্য তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আমিও নিহতের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি।

অপরদিকে দুর্ঘটনার পর ওই এলাকা কর্ডন করে রাখে নৌবাহিনী। তবে দুর্ঘটনা কবলিত বাস দুটিকে দ্রুত সরিয়ে ফেলায় মোংলা-খুলনা মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

বাগেরহাটের কাটাখালী হাইওয়ে থানার ওসি মোঃ জাফর আহমেদ বলেন, মোংলা-খুলনা মহাসড়কে বেপরোয়াভাবে সকল গাড়ী চলাচল করে। নৌবাহিনীর কয়েকটি বাসও চলে এ সড়কে। বিষয়টি নৌবাহিনী সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে বেশ কয়েকবার বলা হলেও আজ পর্যন্ত কোন ফল হয়নি। ফলে আজ এমন দুর্ঘটনা ঘটলো।