সকালে খুলনা-২ আসনের আলিয়া মাদরাসা কেন্দ্রে এবং বিকেলে খুলনা-৩ আসনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে মৃদ উত্তেজনা ছাড়া সার্বিকভাবে খুলনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ যেন উৎসবে রূপ নেয়। নারী-পুরুষ ও তরুণ ভোটারদেও পাশাপাশি কেন্দ্রের আশপাশের প্রার্থীদের নির্বাচনী টেন্টে ছিল উৎসুক জনতার ভিড়। অনেকে ভোটার না হয়েও দেখতে গেছেন দীর্ঘদিন পরের এ প্রত্যাশিত ভোট। খুলনার ছয়টি আসনে এবার ৩৮জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে একটানা বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত ৮৪০ টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা- ৩আসনের রিটার্নিং অফিসার ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের এবং অন্য পাঁচটি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক আ. স. ম. জামসেদ খোন্দকারের দেওয়া তথ্য মতে এবার মোট ৬৩ থেকে ৬৫ শতাংশ ভোট কাষ্ট হয়েছে। সকাল থেকে চারিদিকে উৎসবের আমেজ বিরাজ করলেও আটটার দিকে খুলনা আলিয়া মাদরাসা কেন্দ্রে বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনার এক পর্যায়ে নগর বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মহিবুজ্জামান কচির হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। যেটি পরে আরও কিছুটা উত্তেজনা বাড়িয়ে দিলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তবে বিকেল চারটার দিকে খুলনা-৩ আসনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের উপস্থিতিতেই ওয়ার্ডের আমিরের ওপর আক্রমণ হয় বলে তিনি দাবি করেন। বিকেলে মাহফুজের নির্বাচনী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শনের অংশ হিসেবে বিকেল চারটার কিছু পর তিনি কার্তিক কুল কেন্দ্রে যান। কেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে অবস্থান না করার নিয়ম থাকলেও গেটের সামনে বিপুল সংখ্যক লোকজনের উপস্থিতি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়। কেন্দ্রের দুটি বুথ পরিদর্শনের সময় বাইরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে বলে তিনি জানান।
তার দাবি, ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকরা পরিকল্পিতভাবে একটি ‘মব’ তৈরি করে তাদের ওয়ার্ড আমীর ডা. গোলাম কিবরিয়ার ওপর চড়াও হন। পরে দলীয় কর্মীদের সহায়তায় তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কক্ষে অবস্থান নেন প্রার্থী। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সারাদিন খুলনার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতি ও উৎসব ছিল অনেকটা ঈদের আনন্দের মতো। কিন্তু বেশি প্রার্থী যেসব আসনে সেসব স্থানে কোন কোন প্রার্থী কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষ করে খুলনা-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এজেন্টদের অনেকেই তাদের প্রার্থীদের নাম বলতে পারেননি। বয়রার মেট্রো পুলিশ লাইনস্ স্কুল, নেছারিয়া কামিল মাদরাসা, বৈকালী আ. বারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রসহ অনেক কেন্দ্রেই মিলেছে এমন চিত্র। কোন কোন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টের বুকে একটি দলীয় প্রার্থীর প্রতীকের ব্যাজ লাগানো। ভোটের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরুর আগেই অনেক কেন্দ্রের সামনে ভোটারদেও জড়ো হওয়া শুরু করেন। তবে দুপুর ১২টার পর ভোটারদের উপস্থিতি কমতে থাকে। যদিও বিকেল থেকে আবারো কোন কোন কেন্দ্রে ভিড় বাড়ে।
অপরদিকে খুলনা-৩ আসনের খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র, দৌলতপুর হাজী মুহসিন সরকারি কলেজ, ভাষানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, প্রভাতী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতি কম ছিল। সকাল সোয়া ৮টার দিকে খুলনা-৫ আসনের আওতাধীন পশ্চিম শিরোমনি সরকারি প্রাাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়ান আম্বিয়া বেগম, লাইলী বেগম ও পারভীন বেগমসহ আরো অনেকে। ওই কেন্দ্রটি খুলনা-৫ (ফুলতলা-ডুমুরিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ারের বাড়ি। তাদের মধ্যে আম্বিয়া খাতুন বলেন, অনেক দিন পর ভোট দিতে পারছি। সেই আঠারো (২০১৮) সালে ভোট দিয়েছিলাম। এবার সকাল সকাল চলে এসেছি। ভোট দেয়ার পর অন্য কাজ। ঈদ ঈদ মনে হচ্ছে।
সকালে ওই কেন্দ্রে ভোট দেন জামায়াতের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২০১৮ সালে নির্বাচনে প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে না আসার জন্য সকালে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আসলে গ্রেফতার করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। এটি আমার নিজেরে গ্রাম, জন্মস্থান, যেখানে আমি প্রার্থী ছিলাম, সেখানে আমার এ অবস্থা হলে ভোটারদের কী অবস্থা হতে পারে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতি, নতুন বাংলাদেশ। শত শত ভোটার সকাল থেকে উৎসব মুখর পরিবেশে ভোট দিতে আসছেন।