সুন্দরবনের জোড়াখাল সংলগ্ন গভীর বনাঞ্চলে শিকারীদের পাতা ফাঁদে আটকে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল একটি মায়াবী হরিণ। বৃহস্পতিবার সকালে পায়ে হেঁটে নিয়মিত টহল কার্যক্রম পরিচালনার সময় এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে পান জোড়াখাল টহল ফাঁড়ির বনকর্মীরা। ফাঁদে আটকা পড়া হরিণটিকে দ্রুত উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন তারা। হরিণটি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে পুনরায় তাকে বনে অবমুক্ত করা হয়।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের ২৬ তারিখেও একই এলাকায় আরও একটি হরিণকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেছিলেন বন বিভাগের কর্মীরা। সেদিন আরও একটি বন্যপ্রাণীকে ফাঁদমুক্ত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

পূর্ব সুন্দরবনের জোড়াখাল টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ নজরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "পায়ে হেঁটে টহল প্রদানের সময় আমরা লক্ষ করি একটি হরিণ জীবিত অবস্থায় ফাঁদে আটকে রয়েছে। হরিণটি প্রাণ বাঁচানোর জন্য অনেক চেষ্টা করছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে হরিণটিকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করি এবং পরবর্তীতে বনে ছেড়ে দিই।"

গত তিন মাসে সুন্দরবনে পরিচালিত ব্যাপক অভিযানে ফাঁদমুক্ত করা হয়েছে ২০ হাজারেরও বেশি বন্যপ্রাণী। বন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ফাঁদগুলো সময়মতো উদ্ধার না করা হলে নিরীহ শত শত হরিণ নির্মমভাবে প্রাণ হারাতো। তাই নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহযোগিতাই পারে এই বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত জীবন নিশ্চিত করতে।

পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) রেজাউল করীম চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, "আমরা ব্যাপক হারে জঙ্গল তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করে হরিণ শিকারের জন্য পাতা ফাঁদগুলো অপসারণের কাজ করছি। আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে অনেক স্থানে হরিণ শিকারের ফাঁদ রয়েছে এবং এগুলো ব্যবহার করে নিয়মিত হরিণ শিকার করা হচ্ছে। আমরা এর প্রমাণও পেয়েছি। গত তিন মাসেই আমরা প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি ফাঁদ উদ্ধার করেছি। এই ফাঁদগুলো যদি উদ্ধার করা না যেত, তাহলে অসংখ্য হরিণের মৃত্যু হতো এবং অনেক হরিণ শিকারীদের হাতে চলে যেত।"তিনি আরও জানান, বন বিভাগ ক্রমাগত টহল জোরদার করছে এবং প্রতিটি সন্দেহজনক কার্যকলাপের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে বনে শিকারীদের ফাঁদ উদ্ধারের পর বন বিভাগ যখন কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে, ঠিক তখনই উঠে এসেছে হরিণ শিকারের আরও ভয়াবহ ও পৈশাচিক পদ্ধতির তথ্য। সূত্র অনুযায়ী জানা গেছে, শিকারীরা হরিণের খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে সেগুলো অজ্ঞান করে শিকার করছে। এই পদ্ধতি অত্যন্ত ভয়ংকর এবং পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সুন্দরবনের মায়াবী হরিণকে রক্ষা করতে হলে শুধুমাত্র ফাঁদ উদ্ধার যথেষ্ট নয়, বরং শিকারী চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের দাবি, এই সুসংগঠিত শিকারী সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর শাস্তি প্রদান এবং দীর্ঘমেয়াদী নজরদারি ব্যবস্থা অপরিহার্য।

স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বলছেন, শুধু ফাঁদ অপসারণ নয়, বরং শিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় জনগণকে সচেতন করার মাধ্যমেই এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব। তারা আরও উল্লেখ করেন যে, শিকারীরা স্থানীয়ভাবে সংগঠিত এবং তাদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ভাঙতে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা শিকারী চক্র চিহ্নিত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছেন। তবে এলাকাটির ভৌগোলিক বিস্তৃতি এবং দুর্গম প্রকৃতির কারণে এই কাজ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে তারা উল্লেখ করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবলমাত্র কঠোর শাস্তি এবং ক্রমাগত নজরদারির মাধ্যমেই শিকারীদের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব। তবেই বাঁচবে সুন্দরবনের প্রাণ, সেই মায়াবী হরিণ। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করাও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।