কলারোয়া (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা: কালের আবর্তনে যান্ত্রিক সভ্যতায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি। অতীতে গ্রামের মহিলারা ধান ভানা, হলুদকুটা, মটরশুঁটি, ডাল কুটা ও পৌষ-পার্বনে পিঠা তৈরির জন্য চালের গুঁড়া কুটার জন্য ঢেঁকি ব্যবহার করতেন। এখন আর গ্রাম-বাংলায় ঢেঁকি দেখা যায় না বললেই চলে।

এক সময় গ্রাম-বাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ধান থেকে চাল তৈরি ও চালের আটা তৈরির জন্য ঢেঁকিই ছিল একমাত্র ভরসা। প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে ঢেঁকি ব্যবহার হয়ে আসছে। তখন বাংলার ঘরে ঘরে ধান ভানা, চিড়া কুটা, চালের গুঁড়া করার জন্য ঢেঁকিই ছিল একমাত্র মাধ্যম। বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক ঢেঁকি গৃহস্থের সচ্ছলতা ও সুখ সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে ডিজিটাল যুগে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির কাছে আগেকার দিনের সেই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির ব্যবহার কমে গেছে। কলারোয়া উপজেলার কুশোডাঙ্গা ইউনিয়নের শাকদাহ গ্রামের নূর হোসেনের বাড়ির উঠানে একটি ঢেঁকি পাতানো দেখতে পাওয়া যায়।

৮০-৯০ দশকে জেলার গ্রাম এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের সারা বছরের চাল বাড়িতে পাতানো ঢেঁকিতে ছেঁটে প্রস্তুত করত। ভাদ্রমাসে আউস ও অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে রোপা আমন ধান ঘরে উঠলে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নানা রকম পিঠা ও পায়েস খাওয়ার উৎসব শুরু হত। আর এজন্য প্রতি এলাকায় ঢেঁকি দিয়ে আটা কোটার ধুম পড়ে যেত।

আমন ধান কাটা শেষে পৌষ মাসে ঢেঁকিতে ধান ভাঙার শব্দে অনেকের রাতের ঘুম নষ্ট হতো। আবার ভোর বেলা ঢেঁকির শব্দে অনেকের ঘুম ভাঙত। ধান ভেঙে চাল ছাঁটার জন্য মহিলাদের পাশাপাশি পুরুষরাও ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে ধান ভাঙত। দুইজন মহিলা সারাক্ষণ ঢেঁকিতে পাড় দিত আর একজন ঢেঁকির আগায় বসে শুকনো ধানগুলোকে উনুতে (ভাঙার গর্তে) এগিয়ে দিত। এভাবেই সারা রাত ধরে গ্রামের মা চাচিরা তাদের সারা বছরের চাল ঢেঁকিতে ছেঁটে মাটির কুঠি কিংবা বাশেঁর তৈরি ডোলে ভরে রখত। সে সময় ঢেঁকি ছাটা চালের ভাত খেয়ে অধিকাংশ মানুষই যেমন তৃপ্তি পেত, তেমনি সুস্থ জীবনযাপন করত। বর্তমানে আধুনিক যুগে চাকচিক্কের আধিক্যে হারিয়ে গেছে সেই ঢেঁকি ছাটা চাল। এখন পাড়ায় পাড়ায় ধান ভাঙা, হাসকিং মিল, এমনকি ভ্রাম্যমাণ মিল প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান ভেঙে দেয়ায় ঝকঝকে চাল, খাটুনি কম ও সময় সাশ্রয় হওয়ায় ঢেঁকি আর তেমন একটা চোখে পড়ে না।

ঢেঁকিতে আটা প্রস্তুত করার সময় শাকদাহ গ্রামের গৃহিণী আলেয়া বলেন, মেশিনের তৈরি আটা দিয়ে সকল প্রকার পিঠা তৈরি তেমন ভালো হয় না। যার কারণে এখনও ঢেঁকিতে তৈরি আটা প্রয়োজন হয়। তাই কালের সাক্ষী হিসেবে সে তাদের উঠানে ঢেঁকিটি এখনো পেতে রেখেছেন। বছরে অন্তত দু’এক বার তারা ও পাড়ার অনেকেই এই ঢেঁকিতে এসে আটা তৈরি করে থাকে। তবে আগেকার দিনের মতো ঢেঁকির আর কদর নেই। কোনোদিন হয়তো সেও হয়তো এ ঢেঁকিটি তুলে ফেলবেন। কালের বিবর্তনে গ্রাম-বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির আর দেখাই মিলবে না। আর কিছুদিন পরে নতুন প্রজন্ম ঢেঁকির কথা শুনলে সেটি কী জিনিস, তা বুঝানো মুশকিল হয়ে পড়বে। তাই বাংলার গ্রামের ঐতিহ্য ঢেঁকিকে স্মরণ করাতে হলে জাদুঘরে ঢেঁকি সংরক্ষণ করে রাখা উচিত বলে গ্রামাঞ্চলের মানুষ মনে করেন।

উপজেলার পানিকাউরিয়া গ্রামের অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল ওহাব বলেন, ঢেঁকি আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির এক অপূর্ব নিদর্শন। যখন যন্ত্রচালিত ধান ভানা কল ছিল না তখন ঢেঁকির কদর বেশ ছিল। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে এখন পুরোপুরি ঢেঁকি বিলীন হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে হারানো ঐতিহ্যগুলো নিয়ে বিশেষ মেলার আয়োজন করলে বর্তমান প্রজন্ম ঢেঁকিসহ হারানো ঐতিহ্যগুলো চিনতে পারবে এবং তা রক্ষায় এগিয়ে আসবে।