বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের ভার উপেক্ষা করে কেন্দ্রে আসা প্রবীণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কেউ নাতির হাত ধরে, কেউ পালকিতে চড়ে, আবার কেউবা স্বজনদের কোলে চড়ে ভোটকেন্দ্রে এসেছেন তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে।

দুই নাতির হাত ধরে ভোট দিতে এলেন বৃদ্ধা আনোয়ারা

মাদারীপুর সদর ও রাজৈর মিলিয়ে মাদারীপুর-২ আসন। সদর উপজেলার ঝাউদি ইউনিয়নের একটি গ্রাম ঝাউদি। এ গ্রামের একটি ভোটকেন্দ্র শেখ শহিদুল উচ্চ বিদ্যালয়। এ কেন্দ্রে ভোট দিতে দুই নাতির হাত ধরে আসলেন ৯০ বছর বয়সী আনোয়ারা বেগম। ভোট দিয়ে বললেন, ‘এই প্রথম আমি এরকমভাবে ভোট দিতে পারছি। এর আগে আমি আর ভোট দিতে পারিনি। আগে ভোট দিতে এসে শুনেছি, আমার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ভোট দিয়ে ফেরার পথে এ কথা বলেন আনোয়ারা বেগম। আনোয়ারা বেগম বলেন, এ রকম শান্তিপূর্ণভাবে নিজের ভোট নিজে দিতে পারব, ভাবি নাই। ভোট দিয়ে ভালো লাগছে। ভোট দিতে চেয়েছি, তাই আমার দুই নাতি রাহিল কাজী ও রোহান কাজীর হাতে ভর করে চলে আসলাম।

পালকিতে চড়ে কেন্দ্রে ১০২ বছর বয়সী চান বানু

মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গীবাড়ী) আসনের লৌহজং উপজেলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পালকিতে চড়ে কেন্দ্রে গেলেন ১০২ বছর বয়সী বৃদ্ধা চান বানু। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্রে এ দৃশ্য দেখা যায়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও ভোটাধিকার প্রয়োগে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন চান বানু। নিজ বাড়ি থেকে কয়েকজন স্বজনের সহযোগিতায় তাকে পালকিতে করে ভোটকেন্দ্রে নেওয়া হয়। শতবর্ষী এই ভোটারকে এক নজর দেখতে কৌতূহলী জনতা ভিড় করেন কেন্দ্রের সামনে।

চান বানুর পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি সবসময়ই জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে আসছেন। শারীরিকভাবে দুর্বল হলেও এবারের নির্বাচনেও ভোট দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে পরিবারের সদস্যরা পালকির ব্যবস্থা করেন।

ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, বয়োজ্যেষ্ঠ ভোটারদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চান বানুকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়। স্থানীয়রা বলেন, ১০২ বছর বয়সেও তার ভোট দেওয়ার আগ্রহ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। এটি নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

ছেলের কোলে চড়ে ভোট দিলেন পা হারানো জনাব আলী

ছেলের কোলে চড়ে ভোট দিতে কেন্দ্রে এসেছেন পা হারানো ৭০ বছরের বৃদ্ধ জনাব আলী। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে নাটোর সদর উপজেলার হালসা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন তিনি।

জনাব আলী নাটোর সদর উপজেলার হালসা ইউনিয়নের চিড়াখোলা গ্রামের মৃত নছের ফকিরের ছেলে। পরিবারে স্ত্রী, তিন ছেলেসহ নাতি-নাতনি রয়েছে।

জানা যায়, ২০২৩ সালে জোহরের নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে দুর্ঘটনায় জনাব আলীর ডান পা অকেজো হয়ে যায়। এরপর নিজে চলাফেরার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। তারপর থেকে অন্যের সাহায্যে চলতে হয় এ বৃদ্ধকে। বর্তমানে তিন ছেলের সঙ্গে তিনি থাকেন। জীবনে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে কতবার ভোট দিয়েছেন, তা মনে নেই তার।

বৃদ্ধ জনাব আলী বলেন, ‘অনেক বছর পর ভোট দিতে আইছি, ভোট দিতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। জীবনে কতবার ভোট দিছি, তা মনে নেই। তবে অনেক বার ভোট দিছি। আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে সামনে আবার ভোট দেব।’

ছেলে শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘বাবা হাঁটতে পারেন না, কথাও ঠিক স্পষ্টভাবে বলতে পারেন না। আমাদের সাহায্যে চলতে হয় বাবার। ভোট দিতে খুব আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর আমার কোলে চড়ে বাবা ভোট দিতে কেন্দ্রে আসেন। বাবা তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। ভোট দিয়ে অনেক খুশি তিনি।’

নাতির কোলে চড়ে ভোট দিলেন শতবর্ষী আছিমন বেওয়া

বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, তবুও মনে অদম্য ইচ্ছাÑনিজের ভোটটা নিজেই দেবেন বলে। তাই হাঁটতে না পারলেও থেমে থাকেননি শতবর্ষী আছিমন বেওয়া। নাতির কোলে চড়ে হাজির হয়েছেন ভোটকেন্দ্রে, নিজের অধিকার প্রয়োগ করতে।

দুপুর ১২টার দিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা মডেল কলেজ কেন্দ্রের সামনে এই দৃশ্যের দেখা মেলে। ওই ইউনিয়নের ক্লিনিক পাড়া এলাকার বাসিন্দা আছিমন বেওয়াকে কোলে নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন তার নাতি এরশাদুল হক। বয়সের ভারে নড়াচড়া করতে না পারলেও ভোট দেওয়ার আগ্রহে একটুও ভাটা পড়েনি তার।

ভোট দিয়ে বেরিয়ে আছিমন বেওয়া বলেন, অনেক বয়স হয়ে গেছে বাবা, চলতে পারি না। আজ নাতির কোলে চড়ে আসছি ভোট দিতে। খুব ভালো লাগছে। আগামীতে আর ভোট দিতে পারব কি না, আল্লাহই জানেন।

নাতি এরশাদুল হক বলেন, নানির বয়স অনেক বেশি। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। তাই কোলে করে নিয়ে এসেছি। নানি ভোট দিতে পেরে খুব খুশি হয়েছেন। তার মুখের হাসিটাই আমাদের বড় পাওয়া।