খালাস পেয়েছেন রাজসাক্ষী আবজালুল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে সাবেক এমপি সাইফুলসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। খালাস পেয়েছেন রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হক।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া, আশুলিয়া থানার তৎকালীন এসআই আবদুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা ও কনস্টেবল মুকুল চোকদার।

যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত সাতজন হলেন- ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন ও সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস।

সাত বছরের সাজা পেয়েছেন দুজন। তারা হলেন- এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসান। আর খালাস পেয়েছেন সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হক। তিনি এ মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।

এর আগে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে এ মামলায় গ্রেপ্তার থাকা আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। তাদের উপস্থিতিতে সংক্ষিপ্ত রায় পড়েন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

আসামিদের মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই আবদুল মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে এসআই আবদুল মালেক ও কনস্টেবল মুকুল চোকদারকে।

আশুলিয়ার ওই ঘটনায় শহীদ হয়েছেন মোট সাতজন। তারা হলেন- সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়োজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম।

গত বছরের ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। সে সময় উপস্থিত আট আসামির সাতজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন এসআই শেখ আবজালুল হক। একই বছরের ২ জুলাই প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন আদালত। অভিযোগের সঙ্গে অন্যান্য তথ্যসূত্র হিসেবে ৩১৩ পৃষ্ঠা, দালিলিক প্রমাণাদি ১৬৮ পৃষ্ঠা ও দুটি পেনড্রাইভ যুক্ত করে প্রসিকিউশন।

কোন অভিযোগে কার কী শাস্তি

মামলায় গুলি করে হত্যা, হত্যার পর লাশ পোড়ানো, নির্দেশনা এবং উসকানি-প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের পাচটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে দুটি অভিযোগকে কয়েকটি কাউন্টে (অপরাধমূলক ঘটনা) ভাগ করা হয়। এসব কাউন্টে আসামিদের সাজার পাশাপাশি অর্থদণ্ডও দিয়েছেন আদালত।

সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম : তাকে প্রথম অভিযোগের সাতটি কাউন্টে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া দ্বিতীয় অভিযোগের ১-৩ নম্বর কাউন্টে এবং ৩-৫ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় অনুকূলে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মাঝে বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

সৈয়দ নুরুল ইসলাম : ১ ও ২ নম্বর অভিযোগের সব কাউন্টে এবং ৩-৫ নম্বর অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অন্যান্য যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত : আসামি রিপন, কাফী, শাহিদুল, মাসুদ, নির্মল ও আরাফাত হোসেনকে ১ ও ২ নম্বর অভিযোগের সব কাউন্টে এবং ৩-৫ নম্বর অভিযোগে পৃথকভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শাহিদুল ও নির্মলকে ১ লাখ টাকা এবং বাকিদের ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

এএফএম সায়েদ রনি : সাবেক এই ওসিকে প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগের সব কাউন্টে মৃত্যুদণ্ড এবং তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

মালেক, বিশ্বজিৎ ও মুকুল চোকদার : তাদের প্রথম অভিযোগের সব কাউন্টে যাবজ্জীবন এবং দ্বিতীয় অভিযোগের ১-৩ নম্বর কাউন্টে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেকের ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড হয়েছে।

আরাফাত ও কামরুল : দ্বিতীয় অভিযোগের ১ নম্বর কাউন্টে তাদের সাত বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

রনি ভূঁইয়া : ১৬ নম্বর আসামি রনি ভূঁইয়াকে প্রথম অভিযোগের সব কাউন্টে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ১২ নম্বর আসামি শেখ আবজালুল হককে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুচ্ছেদ ১৫(১) অনুযায়ী ক্ষমা প্রদর্শন করে খালাস দেওয়া হয়।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এসআই মালেক

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের তৎকালীন এসআই আবদুল মালেক।

ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়া থেকে বের হওয়ার সময় উচ্চস্বরে তিনি বলেন, এএসআই মনির আগুন দিয়েছে। রাজসাক্ষী (এসআই শেখ আবজালুল হক) জড়িত ছিল। মিথ্যা মামলায় কেন সাজা দিলো? যারা জড়িত, তাদের আনা হয়নি। আল্লাহ বিচার করবে।

রায় ঘোষণার পর সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের একে একে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় আদালতকক্ষের বাইরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসআই আবদুল মালেকসহ অন্যরা নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মালেক। পরে তাকে ধরাধরি করে হাজতখানায় নিয়ে যান দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।

এদিকে কাঠগড়ায় ওঠার পর থেকেই এসআই শেখ আবজালুল হককে নীরবে তসবিহ জপতে দেখা যায়। তিনি এ মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন। রায় ঘোষণার আগমুহূর্ত পর্যন্ত কখনও চোখ বন্ধ করে, আবার কখনও মাথা নিচু রেখে প্রার্থনায় মগ্ন ছিলেন তিনি।