সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। গতকাল বুধবার সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য জানান তিনি।
জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে সারা দেশে চালানো গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো মামলারই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়নি। আর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হলেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, আশুলিয়া ও রাজধানীর চানখাঁরপুলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরই মধ্যে খসড়া প্রতিবেদন পেয়েছি। সম্প্রতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা গণহত্যার মামলার খসড়া প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। আশা করছি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হাতে পাবো। আর হাতে পাওয়া মাত্রই তা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
তাজুল ইসলাম বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে গণহত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বহু প্রমাণ ও উপাত্ত রয়েছে। কখনো সরাসরি, কখনো টেলিফোনেসহ নানা মাধ্যমে গুলীর নির্দেশ দিয়ে তা আবার নিশ্চিতও করেন শেখ হাসিনা। হেলিকপ্টার থেকে গুলী করার স্পষ্ট নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি। আইনের ভাষায় এ গণহত্যার সুপেরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি শেখ হাসিনার।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, খসড়া প্রতিবেদনটি এখন প্রসিকিউশনের হাতে রয়েছে। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে গণহত্যার চালানোর অজস্র প্রমাণ উঠে এসেছে। শিগগিরই চূড়ান্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আসা খসড়া প্রতিবেদনের বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, রাষ্ট্রীয় যন্ত্রকে ব্যবহার করে, সব বাহিনীকে ব্যবহার করে সে (শেখ হাসিনা) সারা দেশে গণহত্যা চালিয়েছে-এসব উঠে এসেছে। যে সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে, তাতে তার অপরাধ অকাট্যভাবে প্রমাণ করা সম্ভব। বহুমাত্রিক প্রমাণ আমরা পেয়েছি।’ তবে যতগুলো প্রতিবেদন আসবে, সবগুলোতেই তাঁর (শেখ হাসিনা) প্রসঙ্গটি থাকবে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, একাধিকবার অপরাধ প্রমাণে তথ্য প্রমাণ মিলেছে খসড়া তদন্ত রিপোর্টে। পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চূড়ান্ত তালিকা পেলে আমরা ব্যবস্থা নেব। তবে খসড়ার তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ফরমাল চার্জ গঠন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
এর আগে গত ২৭ মার্চ চিফ প্রসিকিউটর জানান, ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে পাঁচ জনকে গুলী করে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত প্রতিবেদনের খসড়া প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে। এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ঈদের পর ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
এর আগে গত ২ অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট রাজধানীর চাঁনখারপুলে গণহত্যা ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের গুলীতে দশম শ্রেণির ছাত্র আনাস হত্যার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫ জনের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা হয়।
গত ১৭ অক্টোবর গণহত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বেঞ্চ ২০ এপ্রিলের মধ্যে শেখ হাসিনার বিরদ্ধে তদন্তকাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এর আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলীবর্ষণ ও হামলায় প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ হারান। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি এবং শীর্ষ সারির নেতাদের বিরুদ্ধে জুলাই-গণহত্যার অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়েছে। বিভিন্ন ভুক্তভোগীর পরিবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছে, যেগুলোর তদন্ত করছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।