শতাধিক গুম ও খুনের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ ১৪ জানুয়ারি ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে আসামীপক্ষের শুনানি শেষে এই দিন ধার্য করা হয়।

ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও তার বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তারা প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগের বিরোধিতা করে অব্যাহতির আবেদন করেন। একইসঙ্গে জিয়াউলের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন কোনো তথ্যপ্রমাণ আনতে পারেনি বলেও দাবি তাদের।

এরপর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী দেয়া দুজনের সাক্ষ্য তুলে ধরেন এবং আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা করেন। পরে আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এ সময় তদন্তকর্মকর্তার কাছে দেওয়া ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দীর কিছু অংশ পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর। জবানবন্দীতে জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন বিভৎসতা তুলে আনেন তিনি। এর মধ্যে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেজর জেনারেল মুজিবকে অনুরোধ করেন ইকবাল করিম। এরপর দেশজুড়ে প্রকাশ্যে বন্দুকযুদ্ধ কিছতা থেমে যায়। কিন্তু আড়ালে ঠিকই এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করেছিলেন জিয়াউল। এছাড়া র‌্যাবের এডিজি পদে আসীন হতেই অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড বাড়িয়ে দেন তিনি। জিয়াউলের এসব কর্মকাণ্ড থামাতে তখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে বোঝানোর জন্য বলা হয়।

তখন ইকবাল করিমের উদ্দেশে জগলুল বলেন, ‘এমন একজন মানুষকে বোঝাতে বলেছেন। যার মাথা পাথর দিয়ে ঠাসা। তাকে বোঝানোর কোনো উপায় নেই।’ নিজের জবানবন্দীতে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া এমনই সব কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।

জিয়াউলের পক্ষে গতকাল শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও তার বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তারা প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগের বিরোধিতা করে জিয়াউলের অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। তাদের মতে এ মামলায় প্রসিকিউশন কোনো তথ্যপ্রমাণ আনতে পারেনি। এজন্য অব্যাহতির (ডিসচার্জ) আবেদনটি ট্রাইব্যুনালের বিবেচনায় রাখার প্রার্থনা করেন।

এদিকে গতকাল সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তার সামনেই এসব শুনানি হয়।

রামপুরায় মানবতাবিরোধী অপরাধে তদন্ত কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে তদন্তকর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন হয়েছে। এ মামলায় আসামীপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৩ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই দিন নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

মামলার তদন্তকর্মকর্তা সৈয়দ আবদুর রউফকে গতকাল অবশিষ্ট জেরা করেন পলাতক আসামীদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী মো. আমির হোসেন। জেরা শেষে এ মামলায় গ্রেপ্তার থাকা রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার আবেদন করেন তার আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। আদালত শুনানি শেষে আবেদনটি মঞ্জুর করে আগামী ১৩ জানুয়ারি সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ঠিক করেন। আইনজীবী জানিয়েছেন, আসামী চঞ্চল চন্দ্র সরকার নিজের পক্ষে নিজেই জবানবন্দী দেবেন।

এ মামলায় হাবিবুর রহমান ছাড়া পলাতক অন্য আসামীরা হলেন-, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়েছিল। আজ সকালে একমাত্র গ্রেপ্তার থাকা আসামী চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে কড়া পুলিশি পাহারায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

প্রসিকিউশনের পক্ষে গতকাল শুনানিতে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও গাজী এমএইচ তামিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া এলাকায় পুলিশের অভিযানে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ওই দিন প্রাণ বাঁচাতে নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকা আমির হোসেনের ওপর ছয় রাউন্ড গুলী ছোড়ে পুলিশ। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। একই দিন পুলিশের গুলীতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন। গুলীতে গুরুতর আহত হয় মায়া ইসলামের ছয় বছর বয়সী নাতি বাসিত খান মুসা, যে দীর্ঘ চিকিৎসার পরও এখনো কথা বলতে পারছে না। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তৎকালীন পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলাটি দায়ের করা হয়।