ময়মনসিংহ সংবাদদাতা
ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাসকে (২৭) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় আরও দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে ওই দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। রোববার তাদের আদালতে প্রেরন করে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেফতারকৃত দুজন হলেন আশিকুর রহমান (২৫) ও কাইয়ুম (২৫)। তাঁদের বাড়ি ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায়। এর আগে এ ঘটনায় পৃথকভাবে অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১৪ পরিচালক নাঈমুল হাসান বলেন, এ ঘটনায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও ভিডিও দেখে পৃথক অভিযান চালিয়ে ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
র্যাব সাতজনকে এবং পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। র্যাবের অভিযানে গ্রেফতারকৃত সাতজন হলেন ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকার পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যার্স (বিডি) লিমিটেড কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ মো. আলমগীর হোসেন (৩৮), কোয়ালিটি ইনচার্জ মো. মিরাজ হোসেন আকন (৪৬), কারখানার শ্রমিক মো. তারেক হোসেন (১৯), মো. লিমন সরকার (২২), মো. মানিক মিয়া (২০), এরশাদ আলী (৩৯) ও নিঝুম উদ্দিন (২০)। পুলিশের অভিযানে গ্রেফার ব্যক্তিরা হলেন ভালুকার বাসিন্দা মো. আজমল হাসান (২৬) ও মো. শাহিন মিয়া (১৯) এবং ব্রাক্ষণবাড়িয়ার মো. নাজমুল (২১)।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, পুলিশের হাতে গ্রেফতার তিনজনকে শনিবার দুপুরে আদালতে হাজির করা হয়েছে। আসামীদের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে গত বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার কর্মী দিপু চন্দ্র দাসকে কারখানা থেকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ডিভাইডারের একটি গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
ময়মনসিংহের র্যাব-১৪ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক নাঈমুল হাসান বলেন, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে। কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ দিপু চন্দ্র দাসকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করে উত্তেজিত জনতার কাছে হস্তান্তর করেন। পুলিশের কাছে কেন হস্তান্তর করেনি এবং তার নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা হয়নি, সে কারণে কারখানার সংশ্লিষ্ট দুই কর্মীকে আমরা গ্রেফতার করেছি।
তিনি আরো জানান, ধর্ম অবমাননার বিষয়টি খুবই অস্পষ্ট। দিপু কী বলেছেন, এটি খোঁজার চেষ্টা করলেও কেউ এটি বলতে পারেনি। কারও সঙ্গে পূর্বশত্রুতা ছিল কি না, সেটি আমরা তদন্ত করে দেখব। ঘটনার সূত্রপাত কার সঙ্গে হয়েছে সেটি শনাক্ত করা যায়নি। আমরা জানতে পেরেছি কাজ করার সময় ফ্লোরেই বাগবিত-া শুরু হয় এবং তাকে কোনোভাবেই আর কারখানার ভেতরে রাখা যাচ্ছিল না। ভিডিও ফুটেজ দেখে আমরা আসামিদের ধরেছি। কী কারণে ঘটনা ঘটেছে তা উদ্ঘাটন ও জড়িত সবাইকে ধরতে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যাবে।
র্যাব হেফাজতে থাকা কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ আলমগীর হোসেন বলেন, কারখানার বাইরে কোনো চায়ের দোকানে দিপু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে কটূক্তি করেছেন এমন খবরে কারখানার ভেতরের শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। শ্রমিকেরা দাবি জানান, তাকে কারখানা থেকে বরখাস্ত করতে হবে। ওই সময় কারখানার বাইরেও একদল লোক এসে জড়ো হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কারখানা থেকে দিপুকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। উত্তেজিত লোকজন দিপুকে নিয়ে গিয়ে এ ঘটনা ঘটায়।
এ ঘটনায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্ধপোড়া লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের পর রাত ১০টার দিকে সৎকার করা হয়।
দিপুর ভাই বলেন, আমার ভাই দুই বছর ধরে এই কারখানায় কোয়ালিটি সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিল। আমার ভাইকে কী কারণে মারল জানি না। ওরা বলতেছে আমার ভাই ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে কিন্তু তার কোনো প্রমাণ নেই। যদি এমনটি বলে থাকে অপরাধ হয়েও থাকে তাহলে আইনের মাধ্যমে বিচার হতে পারত। কিন্তু নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। যে সন্ত্রাসীরা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে মেরেছে, তাদের বিচার চাই।
নিহতের ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস বাদি হয়ে শুক্রবার ১৫০ অজ্ঞাত ব্যক্তির নামে ভালুকা মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।