আওয়ামী লীগ শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন করেছে প্রসিকিউশন।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ আবেদন করেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শুনানিতে জিয়াউলের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর। এসব অভিযোগে ১০৩ জনকে গুম-খুনের বীভৎস বর্ণনা তুলে ধরেন তিনি। এ সংক্রান্ত ভিডিও রয়েছে বলেও জানানো হয়। একপর্যায়ে মামলার একমাত্র আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন করেন তাজুল ইসলাম। তার সঙ্গে প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী ও সহিদুল ইসলাম সরদার শুনানিতে অংশ নেন।
আসামিপক্ষে আইনি লড়াই করেন জিয়াউল আহসানের বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তিনি প্রসিকিউশনের কাছে ভিডিও চান। জবাবে ট্রাইব্যুনালে দাখিলের পর তাকে দেওয়ার কথা জানায় প্রসিকিউশন। এরপর সবকিছু পর্যালোচনা করে নিজের মক্কেলের অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করবেন বলে জানান নাজনীন নাহার। একইসঙ্গে আগামী ৮ জানুয়ারি এ বিষয়ে তার শুনানি করার কথা রয়েছে।
এর আগে সকালে কারাগার থেকে জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। দুপুরের পর মামলার শুনানি শুরু হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় গত ২৩ ডিসেম্বর সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। ১৭ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ আমলে নেন আদালত। একই দিন সকালে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল করে প্রসিকিউশন।
জিয়াউল আহসান সর্বশেষ ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে কারাগারে রয়েছেন তিনি।
সালমান-আনিসুলের আবেদন খারিজ : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কারফিউ জারি ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ফোনালাপের রেকর্ড পরীক্ষার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ওই কল রেকর্ডটি বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করার আবেদন করা হয়েছিল আসামিদের পক্ষ থেকে।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আসামিপক্ষ থেকে অব্যহতি চেয়ে আবেদনের ওপর শুনানিকালে কল রেকর্ড পরীক্ষার আবেদনটি করা হয়েছিল। আদালত আবেদনটি নাকচ করে দিয়ে আগামী মঙ্গলবার আসামিদের অব্যাহতির আবেদনের ওপর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে কারফিউ দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় রোববার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন নির্ধারিত ছিল। আসামিদের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
শুনানির শুরুতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে করা আবেদনে বলেন, 'আন্দোলন চলাকালীন কারফিউ জারি করে হত্যাকাণ্ডের জন্য সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক দুজনের যে ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হয়েছে, সেটি পরীক্ষা করার জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে তাদের ভয়েস রেকর্ড করে ম্যাচিং করলে সঠিক সত্য বেরিয়ে আসবে।' তবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান গোলাম মূর্তজা মজুমদার জানান, আইনে এমন কোনো সুযোগ নেই এবং এই আবেদনটি খারিজ করে দেন।
এ সময় আনিসুল হকের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য গত ১০ ডিসেম্বরের আবেদনের বিষয়ে আদালতের আদেশ জানতে চান আইনজীবী। জবাবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, 'বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য আগে বার কাউন্সিল থেকে অনুমতি নিয়ে আসবেন। তারপর ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।'
শুনানির একপর্যায়ে সালমান ও আনিসুলের আইনজীবী বলেন, 'প্রসিকিউশন বিচারের দিকে যাচ্ছে, আর আমরা চাচ্ছি ন্যায় বিচার।' তখন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শফিউল আলম মাহমুদ পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, 'যখন মামলাটির তদন্ত চলছিল বা ফর্মাল চার্জ দাখিল করেছিল তখন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? বিচার শুরুর হওয়ার আগে এখন কেন এসব বলছেন?' এ সময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আইন অনুযায়ীই বিচার প্রক্রিয়া চলবে।