আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ও জাতীয় দলের ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে রয়েছে জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলা। জুলাই আনেন্দালন চলাকালে গার্মেন্ট কর্মী রুবেলকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ ১৫৬ জনের নাম উল্লেখ করে দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জন আসামী। এছাড়াও সাকিবের বিরুদ্ধে রয়েছে-শেয়ারবাজারে কারসাজির মাধ্যমে ২৫৬ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলা। এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক তলব করলেও সাড়া দেননি। চেক জালিয়াতির মামলায় রয়েছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। তার বিরুদ্ধে থাকা দুদকের মামলার তদন্ত শেষ করতে ৪ মাস সময়ে দিয়েছেন আদালত। এই সময় শেষ হবে এ বছর মার্চে। হত্যা মামলা, চেক জালিয়াতি, শেয়ার বাজার থেকে অর্থলুট ও অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগসহ গ্রেফতারি পরেয়ানা জারি থাকার আসামী সাকিব আল হাসানকে হঠাৎ করেই বাংলাদেশ জাতীয় দলে ফেরানোর বিষয়ে বিসিবির বক্তব্যে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের অন্যতম পেশাদার ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তার দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত কিছু কারণে বেশ সমালোচিত হয়েছেন দেশ-বিদেশে। সাকিবের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, সোনা চোরাচালান, নিষিদ্ধ জুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, কাঁকড়া ব্যবসায়ীদের অর্থ আত্মসাৎ, ক্রিকেটে দুর্নীতি, নির্বাচনী হলফনামায় তথ্য গোপনসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। দুদক চেয়ারম্যান বরাবর জমা পড়া অভিযোগটি সুনির্দিষ্ট এবং দালিলিক তথ্যভিত্তিক দাবি করে অভিযোগকারী জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সাকিবের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেছেন, সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি দুদকের তফসিলভুক্ত। দুদকে করা অভিযোগে সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে ৬ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে ১০৪ কোটি টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, অভিযোগটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে তদন্ত করে এতে সাকিবের বিও অ্যাকাউন্টের লেনদেনের তথ্য ও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ফরচুন সুজ, এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, ওয়ান ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ও বিডিকম অনলাইন লিমিটেডের শেয়ার কারসাজিতে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে বলা হয় অভিযোগে। সাকিব আল হাসান শেয়ারবাজার কারসাজির নায়ক আবুল খায়ের হিরোর গ্রুপের সদস্য উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে সাকিব ছাড়া অন্যদের আর্থিক ক্ষতিপূরণের শাস্তি দেওয়া হয়। তখন শুভেচ্ছা দূত থেকে সাকিবকে না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সাকিব আল হাসান নিষিদ্ধ জুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত উল্লেখ করে অভিযোগে আরও বলা হয়, তিনি বেট উইনার অনলাইন জুয়ার প্রতিষ্ঠানের চুক্তিবদ্ধ ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে ঘোষণা দেন এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ক্রিকেট খেলাসহ অন্যান্য গেইম এবং ক্যাসিনো জুয়ার কারবার প্রমোট করেন। সাকিব আল হাসান এ রূপ অবৈধ কার্যের মাধ্যমে নিজে অপরাধলব্ধ অর্থ উপাজর্ন করেন।
প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, সাকিব তার ব্যবসায়িক অংশীদার রাশেক রহমানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে রিলায়েবল কমোডিটিস এক্সচেঞ্জ কোম্পানি ও বুরাক কমোডিটিস এক্সচেঞ্জ কোম্পানির মাধ্যমে আইন ও বিধি না মেনে স্বর্ণের ব্যবসা করেন। সরকারের শুল্ক ও রাজস্ব এড়িয়ে অবৈধ স্বর্ণের ব্যবসা করে চোরাচালানের অপরাধ করেছেন। এটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ বলে উল্লেখ করা হয়। সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে প্রতারণার মাধ্যমে কাঁকড়া ব্যবসায়ীদের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এতে বলা হয়, ২০১৬ সালে সাতক্ষীরার দাতিনাখালী এলাকায় সাকিব আল হাসান অ্যাগ্রো ফার্ম নামে একটি কাঁকড়ার খামার গড়ে তোলেন। ওই খামারের জন্য সফট সেল কাঁকড়া বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সংগ্রহ করে প্রায় ১ কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধ করেননি তিনি। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে তিনি নিজে অবৈধভাবে লাভবান হয়েছেন।
২০১৯ সালে সাকিব আল হাসান ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর তা গোপন করায় আইসিসি থেকে তাকে দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তার আয় গোপনের অভিযোগ উঠেছে। হলফনামায় তিনি মোনাক মার্কের মালিকানা, পাওয়ার প্ল্যান্টের লাইসেন্স, পিপলস ব্যাংকের মালিকানা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, ট্রাভেল এজেন্সি, হোটেল ব্যবসা, স্বর্ণ আমদানি, অনলাইন জুয়ার সাইটের সঙ্গে সম্পর্ক, কক্সবাজারের হোটেল হোয়াইট স্যান্ডে ২০ হাজার বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেসের মালিকানা, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা, যুক্তরাষ্ট্রে স্ত্রীর নামে বাড়ি কেনার তথ্যসহ আরও অন্যান্য বিষয় হলফনামায় গোপন করেন।
এদিকে, হঠাৎ করেই সাকিব আল হাসানের বাংলাদেশ জাতীয় দলে ফেরানোর কথা জানিয়েছে বিসিবি। শনিবার বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবর দুজন ক্রিকেটারের উদাহরণ টেনে বলেছেন, তারা বাংলাদেশে থাকলে সাকিবও থাকবেন। আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজাও। তিনিও বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। ফলে সাকিবের দেশে ফিরতে কোনো অসুবিধা দেখছেন না আসিফ। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা সত্ত্বেও মাশরাফির দেশে অবস্থানের উদাহরণ টেনে সংবাদ সম্মেলনে আসিফ বলেছেন, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে দুই-তিনটি উদাহরণ আছে। এক মাশরাফি বিন মুর্তজা। সে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। ৩ আগস্টের পর আরেকজন ক্রিকেটারও বাংলাদেশে অবস্থান করেছে। এই দু’জন যদি থাকতে পারে সাকিব আল হাসান কেন নয়?’ আসিফ আরও বলেন, সাকিব সংসদ সদস্য হওয়ার আগে বাংলাদেশের খেলোয়াড় ছিলেন। বাংলাদেশে সাকিবের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, সেই জায়গা থেকেই তাকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া। এ ছাড়া সাকিবের মামলা-সংক্রান্ত বিষয়ে বিসিবির এই পরিচালক বলেন, সাকিবের ব্যক্তিগত ইস্যুগুলো কীভাবে কী হবে এটা সরকারের বিষয়। আমরা বোর্ডের পক্ষ থেকে সাকিবকে চেয়েছি। বোর্ডের যে চুক্তিবদ্ধ প্লেয়ারদের তালিকা হবে, সেখানে আমরা সাকিবকে (রাখার) প্রস্তাব রেখেছি। সে দেশে এসে রিটায়ার করার একটা ইচ্ছা। সাকিব একটা ব্র্যান্ড, এমন প্লেয়ার আমরা আর ১০০ বছরেও পাব না। এরআগে ২০২৪রসালের আগস্টে সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে হওয়া হত্যা মামলায় তার যেন ফুটবলার আমিনুলের মতো কোনো ভোগান্তি না হয়, সে বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাকিবকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে অনেক লেখালেখি হলেও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হকের মামলার সময় দেশের সংবাদমাধ্যম চুপ ছিল।
৪ মাসে মামলার তদন্ত শেষ করার নির্দেশ আদালতের : সাকিব আল হাসানের শেয়ারবাজার কারসাজি, প্রতারণা ও মানিলন্ডারিংয়ের মামলার তদন্ত শেষ করতে ৩ মার্চ পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত। গত বছরের নভেম্বর ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ সাব্বির ফয়েজ প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন। শেয়ারবাজারে কারসাজি, প্রতারণা ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব, তার মা শিরিন আক্তারসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য ৪ মাস সময় পেয়েছে তদন্ত সংস্থা। এছাড়া এদিন দেশের বাইরে থাকা সফলতম এই ক্রিকেটারকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে তাকে বক্তব্য দিতেও বলেছিল দুদক।
চেক জালিয়াতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা: চেক জালিয়াতির একটি মামলায় সাকিব আল হাসানসহ চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার একটি আদালত। সাকিব ও অন্য তিনজন গত বছরের জানুয়ারিতে আদালতে হাজির না হওয়ায় এই আদেশ দেন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. জিয়াউর রহমান। আইএফআইসি ব্যাংকের রিলেশনশিপ অফিসার শাহিবুর রহমান এই মামলা দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার আরেকটি আদালত আসামীদের হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করেন। মামলার নথি অনুযায়ী, সাকিবের মালিকানাধীন এগ্রো ফার্ম ব্যবসার জন্য বিভিন্ন সময় আইএফআইসি ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে ঋণ নেয়। এর বিপরীতে সাকিবের মালিকানাধীন কোম্পানি দুটি চেক ইস্যু করে। পরে, অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে চেকগুলো ডিজঅনার হয়। দুটি চেকের মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
হত্যা মামলার আসামী: জুলাই আন্দোলনের সময় গার্মেন্টসকর্মী রুবেলকে হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে ক্রিকেটার ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা রয়েছে। এ মামলায় সাকিব আল হাসান ২৮ নম্বর এজাহারনামীয় আসামী। ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট রাজধানীর আদাবর থানায় রুবেলের বাবা রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলার এজাহারে ২৮ নম্বর অভিযুক্ত হিসেবে লেখা রয়েছে সাকিব আল হাসানের নাম। হত্যা মামলায় বাকি অভিযুক্তরা হলেন- ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ আরও ১৫৬ জন। আর অজ্ঞাতনামা ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামী করা হয়। মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করে বলেন, গত ৫ আগস্ট রুবেল আদাবরের রিংরোডে প্রতিবাদী মিছিলে অংশ নেন। এ সময় পরিকল্পিতভাবে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দাঙ্গা সৃষ্টি করে বেআইনিভাবে উসকানি ও নির্দেশে কেউ মিছিলে গুলি ছোড়ে। বুক ও পেটে গুলিবিদ্ধ রুবেলকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছর ৭ আগস্ট তিনি মারা যান।
অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগ: সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে রয়েছে অনলাইন জুয়ার সাইটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ। জানা গেছে, দেশের আইনে নিষিদ্ধ জুয়ার (বেটিং সাইট) বিজ্ঞাপন করেন। নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে বিদেশি একটি বেটিং সাইটের প্রোমশনের ভিডিও পোস্ট করেন তিনি। যেখানে দর্শকদের জুয়ার খেলার বিষয়ে উদ্বুদ্ধও করেন তিনি।