রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশু রামিসাকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট থেকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান ভুঁইয়া নিপুন এসব গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক রিপোর্ট সংগ্রহ করেন। এদিকে, ঈদের পরপরই এ মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এছাড়া ইউনিসেফ জানিয়েছে, বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের ওপর একের পর এক বর্বরতা ও সহিংসতার ঘটনায় ইউনিসেফ মর্মাহত ও স্তম্ভিত। শিশুদের বিরুদ্ধে বর্বরতা বন্ধ হতেই হবে।
পুলিশ জানায়, গতকাল শনিবার (সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, রামিসা হত্যাকা-ের ঘটনায় ডিএনএ, ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সিআইডির পক্ষ থেকে সব ফরেনসিক রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তারা হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ এসব ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রিপোর্ট হাতে আসায় এখন অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুতের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ রোববার আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হতে পারে।
এ মামলায় গত বুধবার গ্রেপ্তার আসামী সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার আগে ইয়াবা সেবন করেছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানান এই ঘাতক। ওইদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামী সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। জবানবন্দিতে সোহেল জানায়, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে জ্ঞান হারায় শিশুটি। এর মধ্যে তার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এসময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। লাশ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করে। দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে লাশ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। এছাড়া ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিলেন। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামী আদালতকে জানান, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না।
মামলার সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামীর রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামীর শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন লাশ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় পুলিশ। এ ঘটনার প্রতিবাদে বিক্সোভ মিছিলে উত্তাল হয় সারাদেশ।
ঈদের পর বিচার শুরু: আইনমন্ত্রী
এদিকে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ডিএনএ রিপোর্ট আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পাওয়া গেলে পবিত্র ঈদুল আজহার আগেই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। একই সঙ্গে ঈদের পরপরই এ মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানান তিনি। গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘আইনগত সহায়তায় সমন্বিত উদ্যোগ: দায়িত্ব ও বাস্তবায়ন কৌশল’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। আইনমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের মামলায় ডিএনএ রিপোর্ট অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ৭২ ঘণ্টার বেশি ডিএনএ রিপোর্ট তৈরি করতে সময় লাগার কথা নয়। সে ক্ষেত্রে দ্রুত সময়ের মধ্যে ডিএনএ রিপোর্ট পাওয়া যাবে বলে আশা করি।
তিনি বলেন, ডিএনএ রিপোর্ট ছাড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করলে পরবর্তী সময়ে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। তাই ডিএনএ রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পরপরই পুলিশ চার্জশিট দাখিল করবে। সবকিছু ঠিক থাকলে ঈদের আগেই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে। মামলাটির বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার প্রত্যয় জানিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঈদের ছুটির পরপরই এ নৃশংস হত্যাকা-ের আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হবে। আইনমন্ত্রী বলেন, রামিসা হত্যার বিচার করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যত দ্রুত সম্ভব এই মামলার বিচার শেষ করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিচ্ছে। পুরো বিচার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য রাখতে কাজ করা হচ্ছে। যাতে বিচার শেষে জনমনে কোনো ধরনের সংশয় বা প্রশ্ন না থাকে। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সরকারি আইনগত সহায়তা কেন্দ্রকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। গরিব, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াতে হবে।
শিশুদের বিরুদ্ধে বর্বরতা বন্ধ হতেই হবে
বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশুদের ওপর একের পর এক বর্বরতা ও সহিংসতার ঘটনায় ইউনিসেফ মর্মাহত ও স্তম্ভিত। গতকাল শনিবার এ বিবৃতি দেয় সংস্থাটি। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এক বিবৃতিতে এ কথা বলেছেন। বিবৃতির শিরোনাম ছিল ‘শিশুদের বিরুদ্ধে বর্বরতা বন্ধ হতেই হবে’। এতে বলা হয়, যেখানে শিশুদের সবচেয়ে নিরাপদে থাকার কথা, সেখানেই তারা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। চলতি বছর সারা দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা ও বর্বরতার ঘটনা বেড়েছে। এর ফলে দেশব্যাপী শিশুদের সুরক্ষা এবং জেন্ডার সহিংসতা প্রতিরোধে অবিলম্বে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করে এই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, সহিংসতা প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সুরক্ষা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুল, মাদ্রাসা, কর্মক্ষেত্র, পাড়া-মহল্লা ও শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোর জবাবদিহি আরও বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়। সমাজের মানুষ নীরব থাকলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, সহিংসতা, নির্যাতন ও শোষণের ঘটনা ঘটলে সবাইকে অভিযোগ জানাতে হবে। অভিযোগ জানানোর জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু হেল্পলাইন (১০৯৮) চালু রয়েছে। এখান থেকে শিশুদের জরুরি সহায়তা ও সেবা দেওয়া হয়। ইউনিসেফ বলছে, নিপীড়নের শিকার নারী ও শিশুদের পূর্ণ সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। তাদের ছবি, ভিডিও বা পরিচয় প্রকাশ পায়Ñএমন কোনো ব্যক্তিগত তথ্য ছড়ানো নতুন করে নির্যাতনের শামিল। যারা এসব তথ্য ছড়াচ্ছেন, তারা মূলত ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কষ্ট ও অসম্মানকে আরও বাড়িয়ে তুলছেন। অন্যদিকে, শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে অবিলম্বে রামিসার হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্মিলিত নাগরিক সমাজ। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সম্মিলিত নাগরিক সমাজ আয়োজিত এক মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়।