ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলার তদন্ত শেষে মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম।
এক প্রশ্নের জবাবে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদী নতুন ধারার রাজনীতি শুরু করেছিলেন। সেই রাজনীতির কারণেই ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরীর (বাপ্পী) নির্দেশনা ও পরিকল্পনায় ওসমান বিন হাদীকে গুলী করে হত্যা করা হয়। ওসমান বিন হাদী হত্যা মামলার আসামী এবং গুলীবর্ষণকারী হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও তার সহযোগী আলমগীর আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী। তবে এই তিনজনের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তারা ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে জানিয়েছে ডিবি। এ ছাড়া এ ঘটনায় গুলীবর্ষণকারী ফয়সাল করিমের ভগ্নিপতি এবং ফিলিপ নামে একজন পলাতক আছেন। এই মামলায় এখন পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের সুযোগ রয়েছে বলে জানান শফিকুল ইসলাম।
হত্যার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, শরিফ ওসমান বিন হাদী বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে অতি পরিচিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে সভা-সমাবেশ, ইলেকট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ সংগঠনের বিগত দিনের কার্যকলাপ সম্পর্কে সমালোচনামূলক জোরালো বক্তব্য দিতেন। তার এ ধরনের বক্তব্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হন।
জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরিচিতি পাওয়া হাদী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গেল ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের জন্য বিজয়নগর এলাকায় গিয়ে তিনি আক্রান্ত হন। চলন্ত রিকশায় থাকা হাদীকে গুলী করেন চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা আততায়ী। গুরুতর আহত হাদীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে অস্ত্রোপচার করার পর রাতেই তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর দুদিন পর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে হাদীকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর হাদীর মৃত্যুর খবর আসে।
ভিডিও বার্তা নিয়ে যা বলল ডিবি
আসামী ফয়সাল করিম সম্প্রতি একাধিক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, তিনি বিদেশে আছেন এবং ওসমান হাদী হত্যা মামলায় তাকে ও তার পরিবারকে ফাঁসানো হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ফয়সালের ভিডিও বার্তা পর্যালোচনা করা হয়েছে এবং প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ফয়সাল তিনটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন, সেগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়নি, এটা মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এখনো আসেনি, তবে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ভিডিও বার্তা আসল। তবে ফয়সাল দুবাইতে থাকার যে দাবি করছেন, সেই অবস্থান সঠিক নয়। তদন্তের তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, পলাতক ফয়সাল ভারতে অবস্থান করছেন।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার তথ্য
ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ওয়ার্ড কমিশনার তাইজুল ইসলাম ওরফে বাপ্পী। এই নির্দেশের কারণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, শরিফ ওসমান হাদী একটি নতুন ধরনের রাজনীতি শুরু করছিলেন এবং তার বক্তৃতার মাধ্যমে সরকার, আওয়ামী লীগ বা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিচ্ছিলেন। আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিলর এই সমালোচনার কারণেই ফয়সালকে হত্যা করতে বলেন। এ হত্যা মামলার তদন্তকালে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ব্যালিস্টিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পজিটিভ এসেছে বলেও জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম।
ওসমান হাদী হত্যা মামলার প্রধান আসামী ফয়সাল করিম ও তার সহযোগী ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগে মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে যে বক্তব্য ডিএমপি এর আগে দিয়েছিল, তা সত্য বলেও জানান ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম।
আসামী হলেন যারা
সাংবাদিক সম্মেলনে ডিবি প্রধান জানান, সার্বিক তদন্ত ও সাক্ষ্য প্রমাণে ধৃত আসামীদের ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬৪ ধারা মোতাবেক প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীদের জবানবন্দি, ঘটনাস্থল ও প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, উদ্ধারকৃত আগ্নেয়াস্ত্র, বুলেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস সমূহের ফরেনসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ঘটনার সাথে আসামীদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হওয়ায় এজাহার নামীয় পলাতক আসামী , ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদ (৩৭), মোঃ আলমগীর হোসেন (২৬), মোঃ তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী (৪৩), ফিলিপ স্নাল (৩২), মুক্তি মাহমুদ (৫১), জেসমিন আক্তার (৪২), তদন্তে প্রাপ্ত গ্রেফতারকৃত আসামী, মোঃ হুমায়ুন কবির (৭০), হাসি বেগম (৬০), সাহেদা পারভীন সামিয়া (২৪), ওয়াহিদ আহমেদ শিপু (২৭), মারিয়া আক্তার লিমা (২১), মোঃ কবির (৩৩), মোঃ নুরুজ্জামান ওরফে উজ্জ্বল (৩৪), সিবিয়ন দিও (৩২), সঞ্জয় চিসিম (২৩), মোঃ আমিনুল ইসলাম ওরফে রাজু (৩৭), ও মোঃ ফয়সালের (২৫) বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১২০-বি/৩০২/২০১/১০৯/৩৪ ধারার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিজ্ঞ আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।
চার্জশিটভুক্ত কে এই বাপ্পী : ওসমান বিন হাদীকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি। এ হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পীর নাম প্রকাশ করা হয়েছে। যিনি হাদী হত্যা মামলার তিন নম্বর এজাহারনামীয় আসামী। চাঁদাবাজি ও ক্যাসিনোসহ নানা অপরাধের সাথে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তাজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী একসময় এলাকায় ‘ঝুট বাপ্পী’ নামে পরিচিত ছিলেন। গার্মেন্টস শিল্পের ঝুট কাপড়ের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তার উত্থান। তার বিরুদ্ধে পরিবহন, গার্মেন্টস ঝুট কাপড়, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ফুটপাত ও অস্থায়ী বাজার থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি তাকে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দলছুটদের নিয়ে নতুন দল গড়ে তোলেন সাংবাদিক-রাজনীতিক ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী। প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) নামে ওই দলে যোগ দেন বাপ্পির বাবা নজরুল ইসলাম চৌধুরী। মিরপুর-পল্লবীতে ঝুট মন্টু হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। পিডিপির প্রার্থী হিসেবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেসবের কিছুই হয়নি। পিডিপিতে যোগ দেওয়ার আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মন্টু। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে আবারও আওয়ামী লীগে ফেরেন। ২০০৯ সালের ২৬ মে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের নান্নু মার্কেটের সামনে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী জামিল গ্রুপের গুলীতে নিহত হন মন্টু। এর পরই পল্লবীর ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’ রাজনীতিতে সক্রিয় হন বাপ্পি।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ২৬ বছর বয়সেই মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার অর্ধশত গার্মেন্টের ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ নেন তিনি। এরপর প্রায় ১৫ বছর ধরে মিরপুর ও পল্লবী থানা এলাকার গার্মেন্টের ঝুট কাপড়ের ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য তার। ২০১২ সালের জুলাইয়ে ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হন বাপ্পি। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতির পদ পান তিনি। ২০২০ সালের ২৮ জুলাই রাতে কালশী কবরস্থানের কাছ থেকে রফিকুল ও শহিদুল নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পল্লবী থানা পুলিশ। তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, চারটি গুলী ও ওজন মাপার একটি যন্ত্র উদ্ধার করা হয়। ওজন মাপার যন্ত্র নিয়ে সন্দেহ হয় পুলিশের। খবর দেওয়া হয় বোমা নিস্ক্রিয়করণ ইউনিটকে। পরীক্ষার সময় ঘটে বিস্ফোরণ। এতে আহত হন চার পুলিশ সদস্য ও এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। দীর্ঘ তদন্ত শেষে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট দেয়। এতে বাপ্পিসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এছাড়া চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যাকান্ডের একাধিক মামলার আসামী তিনি।