জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন বা বিচারের আদেশের বিরুদ্ধে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর করা রিভিউ আবেদন খারিজ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্য হলেনÑ জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন ইনুর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও আইনজীবী সিফাত মাহমুদ। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আবেদনটি খারিজ করেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সো-কলড বলে ২৭ নভেম্বর রিভিউ আবেদন করেন ইনু। তার এমন মন্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হিসেবে দেখেন প্রসিকিউশন। একইসঙ্গে ইনুর আবেদনটি বাতিল চাওয়া হয়। ওই দিন এ নিয়ে আংশিক শুনানির পর আজকের দিন ধার্য করা হয়।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে যেসব আইনসম্মত সংজ্ঞা বা উপায় আছে সেসব অবশ্যই করা যাবে। কিন্তু কোনো বিচারপ্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা তথা আজকের রাষ্ট্রটা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত আরেকটি বাংলাদেশ। সে মহান অর্জনের পেছনে ১৪০০ মানুষের রক্তদান, ২৫ হাজারের মতো মানুষের অঙ্গহানি ও অজস্র মানুষের চোখের পানি ঝরেছে। সেই মহান অভ্যুত্থান বা বিপ্লবকে সো-কলড বলা ধৃষ্টতা। এটা আদালত অবমাননা। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা। এ ধরনের কথা আদালতে বলার অধিকার কোনো আসামিরই নেই।
তাজুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল সংবিধানের অধীনে প্রতিষ্ঠিত আদালত। এই ট্রাইব্যুনালের আইনটি বিশেষ আইন ও সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। অতএব এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে দাঁড়িয়ে কোনো কথা বলার অধিকারই আসামীর নেই। তবে আইনের পরিকাঠামোর মাধ্যমে যেসব অধিকার রয়েছে তা অবশ্যই পাবেন (আসামী)। অর্থাৎ নিজের পক্ষে সাক্ষ্য উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভুলত্রুটি চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। এসবের ব্যাপারে পাল্টা যুক্তিও দেওয়া যাবে। কিন্তু আইনকে বা রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার অথরিটি বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের নেই।
গত ২৭ নভেম্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সো-কলড বলে বিচার শুরুর আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ করেন ইনু। তবে তার এমন মন্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে আবেদনটি বাতিল চান প্রসিকিউশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনটি আজ খারিজ করেন ট্রাইব্যুনাল-২।
এর আগে, গত ২ নভেম্বর জাসদের এই সভাপতির বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য গতকালে দিন নির্ধারণ করা হয়। ওই দিন আটটি অভিযোগই ইনুকে পড়ে শোনান বিচারক। একপর্যায়ে নিজেকে পুরোপুরি নির্দোষ দাবি করেন হাসানুল হক ইনু। ২৮ অক্টোবর ইনুর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানিতে কোনো অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে নিজের ক্লায়েন্টের অব্যাহতির আবেদন করেন তিনি। তবে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতা হিসেবে কোনো দায় ইনু এড়াতে পারেন না বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। ২৩ অক্টোবর ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম।
চলতি বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর এ মামলায় ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ ছিল। ২৫ সেপ্টেম্বর এই জাসদ সভাপতির বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টে গণহত্যায় সহযোগিতাসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর শুনানিতে আটটি অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেন আদালত।
গত বছরের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বর্তমানে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই জাসদ নেতা। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজ আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে হেরে যান তিনি।
উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে কুষ্টিয়া শহরে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। পরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা। যাচাই-বাছাই শেষে উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। তার বিরুদ্ধে দেওয়া ফরমাল চার্জটি ৩৯ পৃষ্ঠা সম্বলিত। সাক্ষী করা হয়েছে ২০ জনকে। এছাড়া নথি হিসেবে তিনটি অডিও ও ছয়টি ভিডিও দিয়েছে প্রসিকিউশন।
চানখারপুলে ছয় হত্যা মামলায় সাফাই সাক্ষ্য ৮ ডিসেম্বর
শেখ হাসিনার পতনের দিন চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাফাই সাক্ষ্যের জন্য আগামী ৮ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রোববার ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন নির্ধারণ করেন। অন্য সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ ও সহিদুল ইসলাম।
গতকাল শাহবাগ থানার তৎকালীন ওসি (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেনের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য নেওয়ার আবেদনের ওপর শুনানি করেন আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি। পরে তার আবেদন মঞ্জুর করে তিনজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়ার অনুমতি দেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২৭ নভেম্বর এ আবেদন করেন আরশাদের আইনজীবী।
ওইদিন এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আট আসামীর বিরুদ্ধে মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলামের জেরা শেষ করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামীপক্ষের আইনজীবীরা। গত ১৯ নভেম্বর টানা তৃতীয় দিনের মতো তার সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়। ১২ নভেম্বর শুরু হয় তার জবানবন্দি। সাক্ষ্যে গত বছরের ৫ আগস্ট চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার পেছনে নিজের করা তদন্তের আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করেন তিনি। জব্দ করা সব তথ্যপ্রমাণাদি নিয়েও বর্ণনা দেন। এরপর জেরা শুরু করেন স্টেট ডিফেন্স ও আসামীপক্ষের আইনজীবীরা। টানা তিনদিনের জেরা শেষ হয় গতকাল। সবমিলিয়ে ২৩ কার্যদিবসে ২৬ সাক্ষীর সাক্ষ্য-জেরা সম্পন্ন হয়।
এ মামলার গ্রেপ্তার চার আসামী হলেন- শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলাম।
পলাতক আসামীরা হলেন- সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল।