চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। তবে তারা সবাই পলাতক। এ ছাড়া পাঁচ আসামীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। প্যানেলের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মৃত্যুদ-প্রাপ্ত বাকি দুজন হলেনÑডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এছাড়া রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেনকে চার বছর এবং কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামের তিন বছরের কারাদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলায় আট আসামীর মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন চারজন। তারা হলেনÑআরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুল। তাদের গতকাল সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। তবে হাবিব, আখতারুল, সুদীপ ও ইমরুল এখনও পলাতক।
চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যার প্রমাণ পেয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া ওয়্যারলেস বার্তায় অধস্তনদের মারণাস্ত্র ব্যবহারে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের নির্দেশও প্রমাণিত হয়েছে।
পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের এটি প্রথম মামলা হলেও রায়ের দিক থেকে দ্বিতীয়। ঘটনাটি ঘটেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের দিন। ওই দিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ছয়জন। তারা হলেন, শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইশমামুল হক ও মানিক মিয়া।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দী নেওয়া হয়। জব্দ তালিকা হিসেবে ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি প্রতিবেদন, দুটি অডিও, বই ও ১১টি প্রতিবেদন, ছয়টি মৃত্যুসনদ সংযুক্ত করে জমা দিয়েছে প্রসিকিউশন।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামীপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে গত ২৪ ডিসেম্বর রায়ের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২০ জানুয়ারি এ রায় ঘোষণার কথা থাকলেও প্রস্তুত না হওয়ায় নতুন তারিখ হিসেবে গতকালের দিন ধার্য করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল-১।
রায় নিয়ে প্রসিকিউশনের অসন্তোষ
চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখারপুলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রসিকিউশন। সাজা বাড়াতে আপিলে যাবেন বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
গতকাল সোমবার দুপুরে রায় ঘোষণার পর প্রেস ব্রিফিংয়ে একথা জানান তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে চানখারপুল এলাকায় মুক্তিকামী ছাত্রজনতা যখন অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করে পুলিশ। এ ঘটনার মামলা হয়েছিল। আসামীদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। এতে তিনজনকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছিলেন, যাদের গুলি চালাতে ভিডিওতে দেখা গেছে, যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না রাইফেল নিয়ে গুলি করেছেন; তাদের কম সাজা দেওয়া হয়েছে। একজনকে ছয় বছর, একজন চার বছর, বাকি তিন কনস্টেবলকে তিন বছর করে সাজা দিয়েছেন আদালত। আমরা মনে করি এ সাজা ন্যায়সংগত হয়নি। যদিও আদালতের আদেশ সবার ওপরই শিরোধার্য। তাই আমাদের মানতে হবে। যেহেতু আপিল বিভাগ রয়েছে, সেহেতু এ কম সাজার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা আপিল করবো। তবে পুরোপুরি রায় পাওয়ার পর আরও পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে যেভাবে আমাদের তাজা তরুণরা জীবন দিয়েছেন এবং যারা সরাসরি গুলি চালিয়েছেন; তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর সাজা অল্প হওয়াটা ন্যায়বিচারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে আমরা মনে করছি। এ কারণে মনে করছি যে এটা আপিল করা প্রয়োজন। আমরা আপিল হয়তো করবো। কিন্তু বাকি তিনজনকে যে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে, তা যথার্থ হয়েছে বলে মনে করি।
পাঁচজনেরই মৃত্যুদ- চাইবেন কী না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রত্যেকের মৃত্যুদ-ই চাইবো। কারণ জুলাই অভ্যুত্থানে হাজার হাজার রাউন্ড বুলেট নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ১৪০০ শহীদ ও হাজারও মানুষ আহত হয়েছেন। সেখানে কার গুলিতে কে মারা গিয়েছে সেটা প্রমাণ করা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই। আর সেটা প্রমাণিত না হওয়ার কারণে কেউ সাজা থেকে রেহাই পেতে পারে না। এটা হলো আইনের বিধান, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতি। সুতরাং আমরা মনে করছি এটা আন্তর্জাতিক মানদ-ের সঙ্গে যাচ্ছে না। সে কারণেই আমরা আপিল করবো। কিন্তু তাদের অপরাধ যে প্রমাণিত হয়েছে এবং তা মানবতাবিরোধী-এ প্রসঙ্গে আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তা সঠিক আছে। শুধুমাত্র সেনটেনসিংয়ের (দ- নির্ধারণ) ব্যাপারে আমরা মনে করি সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া উচিত। সেখান থেকে এটা সেটেল হওয়া উচিত যে সরাসরি গুলি বর্ষণের পরও এই সেনটেনসিং থাকা উচিত কি না।
সুজনকে কেন তিন বছরের সাজা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আদালত এটা বলেছেন যে সুজন গুলি করেছে। উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। সবকিছুই আদালত বলেছেন যেটা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে। এক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু আদালত বলেছেন তারা কনস্টেবল ছিলেন। সুপিরিয়ররা তাদের কমান্ড করেছেন, তারা করতে বাধ্য হয়েছেন। এসব বিবেচনায় তাকে কম শাস্তি দিয়েছেন। যেটার ব্যাপারে আমাদের আপত্তি। তবে যারা সুপিরিয়র ছিলেন, তাদের মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। তাদের ব্যাপারে বলা হয়েছে তারা সুপিরিয়র কমান্ডার ছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল অধস্তনদের থামানো বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। তারা সেটা করেননি। উল্টো আদেশ দিয়েছেন। এজন্যই তাদের কমান্ড রেসপনসিবিলিটিতে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনাল আইনে কম সাজা দেওয়ার সুযোগ আছে কি না; এ নিয়ে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামীদের মৃত্যুদ- বা অন্য কোনো সাজা দিতে পারবেন। সুতরাং প্রথম শব্দটা ছিল মৃত্যুদ-। কিন্তু অপরাধ বিবেচনায় সাজা যথার্থ হলো কিনা সেটাই বিবেচ্য বিষয়। এ জায়গায় আমরা বলছি যথোপযুক্ত হয়নি। তাই আপিলের কথা ভাবছি। তবে আইন অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর আপিলের সুযোগ নেই।