মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসহ ১৬টি অধ্যাদেশের বিষয়ে অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এসব অধ্যাদেশ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা ও কোনো অস্বচ্ছতা নেই বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। গতকাল রোববার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ১৩৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি উপস্থিত ছিলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ১১০টি অধ্যাদেশকে বিল আকারে সংসদে আনতে হয়েছে, যা ৯১টি বিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয় এবং সেগুলো সংসদে পাস হয়েছে। তিনি বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে প্রণীত এসব আইনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অস্বচ্ছতা রাখা হয়নি; বরং যেসব অধ্যাদেশে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন, সেগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আসাদুজ্জামান বলেন, ৯৭টি অধ্যাদেশ হুবহু আগের মতোই পাস করা হয়েছে। ১৩টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাস করা হয়েছে এবং ৭টি অধ্যাদেশ রহিতকরণ-সংক্রান্ত বিল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাকি ১৬টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হয়নি। আইনমন্ত্রী বলেন, যেসব অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল হিসেবে আনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেও সংশ্লিষ্ট আইনের প্রস্তাবনায় (প্রিঅ্যাম্বল) স্পষ্টভাবে কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশের কথা তুলে ধরেন। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আরও পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বিলেই উল্লেখ করা হয়েছে। মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার কোথাও কোনো অস্পষ্টতা রাখেনি। সংসদের মাধ্যমে বিল উপস্থাপন করা মানেই সেটি আইনে পরিণত হয়। এমনকি রহিতকরণ বিলও আইনের অংশ হয়ে যায়, যেখানে পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের প্রতিশ্রুতি থাকে।
গুমসংক্রান্ত আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, গুমের সংজ্ঞা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আইনে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ কারণে বিষয়টি আরও বিশদভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন। একইভাবে মানবাধিকার কমিশন আইনের কিছু ধারা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে তদন্ত, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনার অভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, এসব বিষয় নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের পর মানবাধিকার কমিশন আইন নিয়ে পরামর্শসভা আয়োজন করা হতে পারে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় জারি হওয়া ১২২টি অধ্যাদেশের মধ্যে মাত্র ৫৪টি আইনে পরিণত হয়েছিল, বাকিগুলো বাতিল হয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে বর্তমান সরকার অধিকসংখ্যক অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করেছে, উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যেসব অধ্যাদেশ এখনো আইনে পরিণত হয়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রেও আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা রয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিচালিত গণভোট এবং সাধারণ নির্বাচন বা অন্যান্য ভোট এক বিষয় নয়। সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এমনটা জানান তিনি। একইসঙ্গে ১৪২ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যাও দেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিচালিত গণভোট এবং সাধারণ নির্বাচন বা অন্যান্য ভোট এক বিষয় নয়। সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিশেষ প্রয়োজনে যে গণভোটের বিধান রয়েছে, তার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সাধারণ ভোটের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ সময় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, গণভোট অধ্যাদেশ অনুসারে আরপিও অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন গণভোট অনুষ্ঠান করেছে। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে সাংবিধানিক যে গণভোট, এই গণভোট সেই গণভোট না। ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে যে গণভোট সেটি হচ্ছে সংবিধানের প্রস্তাবনা আর্টিকেল ৮, ৪৮, ৫৬, ১৪২। এসব আর্টিকেলে যদি কোনো সংশোধনী আসে, তাহলে রাষ্ট্রপতি এটি অনুমোদন করার আগে গণভোট দিতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে এই গণভোটের প্রস্তাব করা হয়েছিল উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রস্তাবটি আমিই করেছিলাম। তখন আমরা বলেছিলাম জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরিত হবে, সবাই যখন চাচ্ছে এর আইনগত ভিত্তি কি হবে। ওই সময় আইনগত ভিত্তির জন্য আমরা আর কোনো উপায় দেখিনি। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ও গণভোটের ব্যাখ্যা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে যে গণভোটের কথা বলা হয়েছে, সেটি মূলত সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক কাঠামো বা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের একটি বিশেষ পদ্ধতি। একে সাধারণ নির্বাচনের ভোটের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি কোনো গণভোট করতে হয়, তাহলে হয় সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসারে করতে হবে অথবা সংবিধানের বাইরে। যেহেতু সংবিধানে এমন কিছু বলা নেই যে, সরকার চাইলে আর কোনো গণভোট করতে পারবে না। সুতরাং, অন্য কোনো বিষয়ে সেটা করতে চাইলে আলাদা একটা আইন পাস করতে হবে। সে হিসেবে তখন যদি প্রয়োজন হয় নতুন গণভোট হতে পারে।