কল্যাণমুখী আইন প্রণয়ন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নত আইনশৃঙ্খলা ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে আইন, বিচারব্যবস্থা ও স্বরাষ্ট্র খাতের মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঘোষিত দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে এসব অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়।

বিশেষভাবে ধর্মভিত্তিক পার্সোনাল ল সংরক্ষণ ও সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে ইশতেহারে বলা হয়েছে, মুসলিমদের জন্য ইসলামী শরীয়াহর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি স্বতন্ত্র ‘মুসলিম পার্সোনাল ল’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে পার্সোনাল ল সংক্রান্ত মামলার দ্রুত ও সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ বেঞ্চ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে আট ভাগে বিভক্ত ৪১ দফার এই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা আ. ন. ম. শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়ে এবং ‘চলো সবাই একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে ইশতেহারটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে জানায় দলটি। এতে মোট ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে।

আইন ও বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি

ইশতেহারে বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
বিচার প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে মামলার জট নিরসন, পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, একটি স্বাধীন ও দক্ষ প্রসিকিউশন সার্ভিস গঠন এবং মানবাধিকার পরিপন্থী ও নিবর্তনমূলক আইন সংস্কার।

এছাড়া গণগ্রেপ্তার, রিমান্ডে নির্যাতন, গুম ও ‘আয়নাঘর’-এর মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নারীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি নিশ্চিত করা, পারিবারিক আদালত আইন আধুনিকায়ন, বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন, গ্রাম আদালত ও আইনগত সহায়তা ব্যবস্থার সংস্কারের কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।

পাশাপাশি সাক্ষ্য আইন আধুনিকায়ন, ঔপনিবেশিক আমলের দণ্ডবিধি ও কার্যবিধিসমূহ সংস্কার, ওয়াকফ ও যাকাত ব্যবস্থার আইন কার্যকরকরণ এবং দরিদ্র ও অসচ্ছল মানুষের জন্য থানা পর্যায়ে লিগ্যাল এইড সেল গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে।

গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদঘাটনে জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তায় ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ ও একটি টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণাও ইশতেহারে রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা খাতে সংস্কার

ইশতেহারে স্বরাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা খাতের মৌলিক সংস্কারের কথাও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছ নিয়োগ ও আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গঠন, পুলিশকে দুর্নীতি ও ঘুষমুক্ত করা, কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং জোরদার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন, স্মার্ট সিটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু, কারাগার সংস্কার, ঔপনিবেশিক পুলিশ আইন বাতিল করে পুলিশ রিফর্ম কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে মোট ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে—৫টি ‘হ্যাঁ’ (সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান) এবং ৫টি ‘না’ (দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি)। ‘জাতীয় স্বার্থে আপসহীন বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং নারী ও যুব সমাজের ক্ষমতায়নের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

জামায়াতের প্রচার বিভাগ জানায়, দেশ-বিদেশের ২৫০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞের মতামত এবং ‘জনতার ইশতেহার’ ওয়েবসাইটে পাওয়া প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, পাকিস্তান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদরা উপস্থিত ছিলেন।