মানব পাচারের মামলায় রিমান্ডে থাকা এক-এগারোর আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সম্পদের তথ্য তলবের উদ্যোগ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রিক্রুটিং এজেন্সি ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড সংশ্লিষ্ট চারজনের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। দুদক যাদের নোটিস পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নূর মোহাম্মদ আব্দুল মুকিত, মেহবুবা আফতাব সাথী ও তাসনিয়া মাসুদ। এ চারজনই ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালের অংশীদার। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কোম্পানির এমডি।
দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস জারির অনুমোদন আগেই কমিশন দিয়েছিল। তবে সে সময় তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা না যাওয়ায় নোটিস পাঠানো হয়নি। তিনি বলেন, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ায় তিনিসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস জারির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা দুদকের মামলায় সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে এই আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ। এ বিষয়ে শুনানির জন্য ৯ এপ্রিল দিন রেখেছেন আদালত।
দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, এ বিষয়ে আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য আগামী ৯ এপ্রিল দিন রেখেছেন বিচারক।
২০০৭-০৮ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের আলোচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির টিকেটে ফেনী-৩ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন।
ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগেই গত ১১ মার্চ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে এ মামলা করে দুদক। এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনে বলা হয়, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং মামলার অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্যে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করেন। তারা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করে মালয়েশিয়া শ্রমিক রিক্রুটের জন্য এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ পান। রিক্রুটেড শ্রমিকদের ক্ষতি করে বিভিন্ন ধাপে বাড়তি অর্থ গ্রহণের অসৎ উদ্দেশ্যে সরকার দলীয় এমপির প্রভাব খাটিয়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করেন। তারা চুক্তিবদ্ধ আইনসঙ্গত পারিশ্রমিক ব্যতীত এবং চুক্তি বহির্ভুত কর্মকা- করে পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে অবৈধ পারিতোষিক গ্রহণ করেন।
আবেদনে বলা হয়, সাত হাজার ১২৪ জন কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে মোট ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন আসামিরা। এ অভিযোগে গত ১১ মার্চ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তিনি জামিনে মুক্তি পেলে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো বিশেষ প্রয়োজন।
গত সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার তাকে আদালতে হাজির করে মানব পাচার ও অর্থ আত্মসাতের এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডের আবেদন করে গোয়েন্দা পুলিশ। গত বছর ৩ সেপ্টেম্বর পল্টন থানায় এ মামলা দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটার আলতাব খান। ডিবি পুলিশের আবেদনের ওপর শুনানি করে আদালত মঙ্গলবার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠায়। রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে বিক্ষুদ্ধ জনতা তার ওপর ডিম ও ময়লা পানি নিক্ষেপ করে।
২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের জিওসির দায়িত্বে থাকা মেজর জেনারেল মাসুদ এক-এগারোর পট পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেয়ে লেফটেনেন্ট জেনারেল হন। সে সময় আলোচিত ‘গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন তিনি। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন তখনকার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এম এ মতিন। তবে জরুরি অবস্থার ওই সময়ে পর্দার আড়ালে থেকে জেনারেল মাসুদই যৌথবাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হত।
সেনা কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী শীর্ষ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করত এবং পরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা দেওয়া হত। বলা হয়, ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি এবং ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা কর্মকর্তাদের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (পরে চার তারকা জেনারেল হন) মইন উ আহমেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি কার্যত সেই প্রভাবশালী কমিটি (গুরুতর অপরাধ দমন-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি) পরিচালনা করতেন, যাদের নির্দেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষ কয়েকজন ব্যবসায়ীকেও সে সময় আটক করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় গ্রেপ্তার করে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়েছিল। বন্দি অবস্থায় তারেক রহমানকে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০০৮ সালের জুনে লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বাংলাদেশের হাই কমিশনার করে পাঠানো হয় অস্ট্রেলিয়ায়। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারও তাকে সেই দায়িত্বে রাখে। অবসরের সময় হয়ে গেলে তার চাকরির মেয়াদ ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর ঢাকায় একটি পাঁচ তারকা মানের হোটেল খুলে ব্যবসা শুরু করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পাশাপাশি শুরু করেন জনশক্তি রপ্তানির ব্যবসা।