চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজউকের প্লট দুর্নীতির পৃথক তিন মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে প্রতিটি মামলায় ৭ বছর করে তিন মামলায় ২১ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। শেখ হাসিনার পাশাপাশি তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে একটি মামলায় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে আরেক মামলায় পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ঢাকা শহরে বাড়ি বা ফ্ল্যাট বা আবাসন সুবিধা থাকার সেই তথ্য গোপন করে তারা আইন ভেঙে দুর্নীতির মাধ্যমে ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা আকারের তিনটি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ওই তিন মামলার রায় ঘোষণা করেন। পৃথক তিন মামলায় আসামীর সংখ্যা ৪৭। তবে ব্যক্তি হিসাবে এই সংখ্যা ২৩।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে গত ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এবার তাকে দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ড দেওয়া হল। তিনি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাবেক রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান, দুর্নীতির দায়ে যার সাজার রায় এল।
হাসিনা পরিবারের তিনজন ছাড়াও এ তিন মামলায় আরো ২০ জন আসামী ছিলেন, তাদের মধ্যে কেবল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার খালাস পেয়েছেন। বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে। আসামীদের মধ্যে কেবল রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম আত্মসমর্পণ করে কারাগারে ছিলেন। রায় ঘোষণার সময় তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতকে সম্মান দেখিয়ে আত্মসমর্পণ করায় তাকে লঘু শাস্তি হিসেবে এক বছর করে তিন মামলায় ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা, তার ছেলে, মেয়েসহ বাকি আসামীদের পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে। ফলে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তারা পাননি। তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানিতে অংশ নিতে পারেননি। কারাদণ্ডের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে এক লাখ টাকা করে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে তাকে ৬ মাস করে ১৮ মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড; পুতুল ও জয়কে দণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ৬ মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
শেখ হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে তিন মামলায় দুদকের পক্ষে শুনানি করেন খান মো. মাইনুল হাসান লিপন। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সাজা (যাবজ্জীবন) প্রত্যাশা করেছিলাম, তা হয়নি। কমিশনের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব। অন্যদিকে গ্রেপ্তার একমাত্র আসামী খুরশীদ আলমের আইনজীবী ছিলেন শাহীনুর রহমান। রায়ের পর তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে গত ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে সর্বোচ্চ সাজা প্রাণদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ আমলের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের মাধ্যমে রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৬০ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে গত জানুয়ারিতে ছয়টি মামলা করে দুদক। এসব মামলায় শেখ হাসিনা ছাড়াও তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, ভাগ্নি ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী ও ভাগ্নে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে আসামী করা হয়। হাসিনাকে আসামী করা হয় ছয় মামলাতেই। তার পরিবারের তিনটি মামলার বিচার চলে একসঙ্গে; আলাদা আদালতে রেহানা পরিবারের তিন মামলার বিচার একসঙ্গে চলে।
গত ৩১ জুলাই এসব মামলায় হাসিনা ও রেহেনা পরিবারের সাত সদস্যসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে ( বেশিরভাগই একাধিক মামলায় অভিযুক্ত) অভিযোগ গঠন করে আদালত।চার মাসের মাথায় গত ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে হাসিনা পরিবারের মামলার রায়ের দিন ঠিক করা হয়। আর ২৫ নভেম্বর রেহানার পরিবারের এক মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১ ডিসেম্বর রায়ের দিন রেখেছে আদালত।
মামলা থেকে যেভাবে রায় : গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেদিনই ভারতে পালিয়ে যান তিনি। তার পরিবারের অন্যরাও দেশের বাইরে। ওই সময় থেকেই একের পর এক মামলা হতে থাকে থানা ও আদালতে। ২৬ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ছয়টি প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
পূর্বাচলের ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর সড়কের আশপাশের এলাকায় শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোট বোন শেখ রেহানা এবং তার ছেলে-মেয়ে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিকের নামে প্লটগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা ১০ কাঠার প্লট (প্লট নম্বর ৯) বরাদ্দ পেয়েছেন। ২০২২ সালের ৩ আগস্ট তার নামে রাজউক প্লটের বরাদ্দপত্র দেয়। সজীব ওয়াজেদ জয় (প্লট নম্বর ১৫) এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও (প্লট নম্বর ১৭) ১০ কাঠা করে প্লট পেয়েছেন। জয়ের বরাদ্দপত্র ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর দেওয়া হয় এবং ১০ নভেম্বর মালিকানা সংক্রান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। পুতুলের বরাদ্দপত্র দেওয়া হয় ওই বছরের ২ নভেম্বর। শেখ রেহানাও ১০ কাঠার প্লট (প্লট নম্বর ১৩) বরাদ্দ পেয়েছেন। তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববির (প্লট নম্বর ১১) এবং মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তীর (প্লট নম্বর ১৯) নামেও একই পরিমাণের প্লট বরাদ্দ হয়েছে।
তার আগে অক্টোবর মাসে শেখ হাসিনার পরিবারের ছয় সদস্যের নামে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আসা অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে দেয় হাই কোর্ট। একইসঙ্গে এ কমিটিকে আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরে (২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে) রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগও তদন্ত করতে বলা হয়।
১৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনাসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন দুদকের উপ পরিচালক সালাহউদ্দিন। তদন্তে পাওয়া আরো চারজনসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ১০ মার্চ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া। আর পুতুলের প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে তিনি ও তার মা শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে ১২ জানুয়ারি মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া।
মামলার এজাহারে বলা হয়, পুতুলের নিজের বা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মালিকানায় ঢাকা শহরে রাজউকের এলাকায় বাড়ি বা ফ্ল্যাট বা আবাসন সুবিধা রয়েছে। এ তথ্য গোপন করে রাজউকের আরেক প্রকল্প পূর্বাচল নতুন শহরে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন পুতুল। সরকারের সর্বোচ্চ পদে থাকাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের প্রভাবিত ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।
এজাহারে বলা হয়, আসামীরা একে অন্যের সঙ্গে যোগসাজশ করে নিজেরা লাভবান হয়ে ও অন্যকে লাভবান করার জন্য পুতুলের নামে প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে। তদন্তে পাওয়া আরো দুই আসামীসহ মোট ১৮ জনের বিরুদ্ধে ১০ মার্চ অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা আফনান জান্নাত কেয়া।
জয়ের প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে তিনি এবং তার মা শেখ হাসিনাসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে ১৪ জানুয়ারি মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক এস এম রাশেদুল হাসান। তদন্তে নাম আসা আরো দুজনসহ মোট ১৭ জনের বিরুদ্ধে ২৪ মার্চ অভিযোগপত্র দাখিল করেন রাশেদুল হাসান।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছেলের নামে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন। অথচ জয় প্লট বরাদ্দ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। চলতি বছর এপ্রিলে আদালত মামলার অভিযোগপত্রগুলো গ্রহণ করে শেখ হাসিনা, জয়, পুতুলসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তাদের গ্রেপ্তার করা গেল কি না, সেই সংক্রান্ত প্রতিবেদন পুলিশকে জমা দিতে বলা হয়। তবে তাদের গ্রেপ্তার করা যায়নি জানিয়ে প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। তাদের আদালতে হাজির হতে গেজেট প্রকাশ করা হয়। তবুও তারা আদালতে হাজির হননি। আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে গত ৩১ জুলাই তিন মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। গত ১১ অগাস্ট মামলা তিনটিতে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
শেখ হাসিনার মামলায় ১৭ খুরশীদ আলম আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। অপর আসামীরা পলাতক থাকায় নিজেদের নির্দোষ দাবি করতে পারেননি। ২৩ নভেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ঠিক করা হয়। একইদিনে জয় ও পুতুলের মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের দিন ঠিক করে আদালত।
২৩ নভেম্বর হাসিনার মামলা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয় এবং জয় ও পুতুলের মামলায় আত্মপক্ষ শুনানি ও যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায়ের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার ঠিক করা হয়।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছিল বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আপিলে তিনি দুই মামলাতেই খালাস পান। তার আগে সাবেক সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এক ডজনের বেশি দুর্নীতির মামলার আসামী হন। তার মধ্যে জনতা টাওয়ারসহ একাধিক মামলায় তিনি হন দণ্ডি ত।
মামলার আসামী যারা : শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়া অপর ২০ আসামী হলেন সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) শফি উল হক, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, মেজর (ইঞ্জি.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী, রাজউকের সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) নায়েব আলী শরীফ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, জাতীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলাম, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. কামরুল ইসলাম, উপপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান, উপপরিচালক হাবিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মাদ সালাউদ্দিন। আসামীদের মধ্যে একমাত্র মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গ্রেপ্তার আছেন।
একটি মামলায় শেখ হাসিনাসহ আসামী ১২ জন। আরেকটি মামলায় শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়সহ আসামী ১৭ জন। অপর মামলায় শেখ হাসিনা, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ আসামি ১৮ জন।
প্লট বরাদ্দের দুর্নীতির অভিযোগে গত জানুয়ারিতে পৃথক ৬টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই মামলাগুলোয় শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে ব্রিটিশ এমপি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক, মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকসহ অন্যদের আসামী করা হয়। এই ছয় মামলার মধ্যে তিনটির রায় হলো গতকাল বৃহস্পতিবার।
অন্যদের যে সাজা হলো : শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ছাড়া অপর ১৯ আসামীর মধ্যে একজন তিন মামলাতেই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তাঁর নাম মো. সাইফুল ইসলাম সরকার। তিনি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে খালাস দেওয়া হয়।
আসামীদের মধ্যে একমাত্র গ্রেপ্তার আছেন রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তিন মামলায় তাঁকে এক বছর করে মোট তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তিন মামলায় তাঁকে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে এক মাস করে মোট তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণা উপলক্ষে আজ তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
তিন মামলায় সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এক লাখ টাকা করে মোট তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে দেড় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকারকে তিন মামলায় ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এক লাখ টাকা করে মোট তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে দেড় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে ৩ মামলায় ৬ বছর করে মোট ১৮ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এক লাখ টাকা করে মোট তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ছয় মাস করে দেড় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞাকে তিন মামলায় ৫ বছর করে মোট ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫০ হাজার টাকা করে মোট দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে, অনাদায়ে তিন মাস করে নয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনকে ২ মামলায় ৬ বছর করে মোট ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে ছয় মাস করে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনকে তিন মামলায় তিন বছর করে মোট নয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে দুই মাস করে ছয় মাসের কারাদ- দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সাবেক সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (অব.) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরীকে তিন মামলায় তিন বছর করে মোট নয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার টাকা করে মোট ৬০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে দুই মাস করে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদারকে তিন মামলায় এক বছর করে মোট তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫, ১০ ও ৫ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড। অনাদায়ে এক মাস করে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাসকে দুই মামলায় তিন বছর করে মোট ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে দুই মাস করে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মো. নুরুল ইসলামকে দুই মামলায় তিন বছর করে মোট ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অনাদায়ে দুই মাস করে চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদকে এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলামকে এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) মো. কামরুল ইসলামকে এক মামলায় তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে দুই মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাফিজুর রহমানকে এক মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মো. হাবিবুর রহমান সবুজকে এক মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) নায়েব আলী শরীফকে ২ মামলায় ১ বছর করে মোট ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ১ মাস করে ২ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সহকারী পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-৩) মাজহারুল ইসলামকে এক মামলায় এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সম্পদের প্রতি শেখ হাসিনার ‘এত লোভ’! বিস্মিত বিচারক
শেখ হাসিনা একজন পলিটিক্যাল লিডার, চারবারের প্রধানমন্ত্রী। তার কেন এতো টাকা লাগবে, এতো সম্পদ লাগবে? ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্লট দুর্নীতির তিন মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার আগে পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। বিস্মিত হয়ে তিনি এও বলেন, তার সম্পদের প্রতি এত লোভ!
এই তিন মামলায় গ্রেফতার একমাত্র আসামী রাজউকের সাবেক সদস্য খুরশীদ আলমকে এদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার আগে ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে এজলাসে তোলা হয়। ১১টা ২৩ মিনিটে বিচারক এজলাসে ওঠেন। প্রথমে শেখ হাসিনাসহ ১২ জনের মামলার রায় পড়া শুরু হয়।
পর্যবেক্ষণে বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর একটি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নিজ নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর রোড থেকে ১০ কাঠা করে ৬০ কাঠার ছয়টি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন। এরপর দুদক টিম গঠন করে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের রিপোর্টের ভিত্তিতে গত ১২ জানুয়ারি মামলা দায়েরের অনুমতি দেয় দুদক। এরপর অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
বিচারক বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিধি অনুসারে, প্লট বরাদ্দ প্রার্থীর আবেদন ব্যতীত কর্তৃপক্ষ কোনো বরাদ্দ প্রদান করবে না। বিধি ৫ অনুসারে প্রেসক্রাইবড ফরম ব্যতীত আবেদন করা যাবে না। শেখ হাসিনার কোনো আবেদন না থাকা সত্ত্বেও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের নির্দেশে ১৩অ(২)(রর) বিধি লঙ্ঘন করে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার অনুকূলে রাজউকের প্লট বরাদ্দের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ে নোট ইনিশিয়েট করা হয়। ওই নোটে স্বাক্ষর করেন পূরবী গোলদার, সাইফুল ইসলাম সরকার, কাজী ওয়াছি উদ্দিন, শহীদ উল্লা খন্দকার এবং শরীফ আহমেদ। পরদিন ১৯ জুলাই শেখ হাসিনার জন্য প্লট বরাদ্দের অনুরোধ জানিয়ে পূরবী গোলদার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি রাজউকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়। ২৭ জুলাই রাজউকের বোর্ড সভায় আনিছুর রহমান, শফি উল হক, খুরশীদ আলম, নাসির উদ্দীন এবং সামসুদ্দীন ওই সভায় রেজ্যুলেশন গ্রহণ করে শেখ হাসিনাকে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেন। প্রেসক্রাইবড ফরমে শেখ হাসিনার কোনো আবেদন না থাকা সত্ত্বেও বিধি ৫ ও বিধি ১৩অ(২)(রর) লঙ্ঘন করে শেখ হাসিনাকে প্লট দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২৭ জুলাই রাজউকের উপপরিচালক নায়েব আলী শরীফ স্বাক্ষরিত পত্রে শেখ হাসিনাকে পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পে বিধি ১৩(অ)(১)(ধ) অনুসারে ১০ কাঠার প্লট পাওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মর্মে শেখ হাসিনাকে জানানো হয়। ওই পত্রে নোটারি পাবলিক কর্তৃক প্রত্যয়ন করা হলফনামাসহ অন্যান্য কাগজপত্রে ৩১ অগাস্টের মধ্যে প্রেরণ করার অনুরোধ করা হয়। ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পাদিত নোটারি পাবলিক কর্তৃক প্রত্যায়িত হলফনামায় উল্লেখ করতে হবে যে, রাজউকের অদিক্ষেত্রে আবেদনকারীর নিজ নামে বা তার স্বামী/স্ত্রী/পরিবার/পোষ্যদের নামে ইতিপূর্বে রাজউক থেকে বা অন্য কোনো সরকারি/আধা সরকারি সংস্থা থেকে ইতিপূর্বে প্লট বরাদ্দ করা হয়নি।
বিচারক বলেন, শেখ হাসিনা রাজউকে হলফনামা দাখিল করেন। কিন্তু হলফনামাটি নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে শপথ করা ছিল না। এতে তিনি কেবল নিজ নামে কোনো প্লট বরাদ্দ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করলেও তার স্বামী এম ওয়াজেদ আলীর নামে লিজ ডিড মূলে ১৯৭৩ সালে সরকারি জমি বরাদ্দের বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করেননি। নোটারি পাবলিক কর্তৃক প্রত্যায়িত না হওয়ায় হলফনামাটি আইনগতভাবে অকার্যকর ছিল, রাজউকের তা বিবেচনা করার কোনো সুযোগ ছিল না। তবুও অবৈধ ও অকার্যকর সেই হলফনামাকে ভিত্তি করে আসামিদের যোগসাজশে প্লটের অস্থায়ী বরাদ্দপত্র ৩১ জুলাই জারি করা হয়।
পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, অস্থায়ী বরাদ্দপত্র অনুযায়ী প্লটের মূল্য নির্ধারিত হয় কাঠা প্রতি তিন লাখ টাকা। ১০ কাঠা জমির মূল্য ৩০ লাখ টাকা। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম কিস্তি ১২ লাখ টাকা জমা দিতে বলা হয়। শেখ হাসিনার নামে ওই বছরের ৩ অগাস্ট সোনালী ব্যাংকের গণভবন শাখা থেকে রাজউকের অনুকূলে ১২ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দেওয়া হয়। ওই দিনই রাজউকের ২৭ নম্বর সেক্টরের কূটনৈতিক জোনের ২০৩ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর প্লট শেখ হাসিনার অনুকূলে চূড়ান্ত বরাদ্দপত্র জারি করা হয়। প্লটের নির্ধারিত মূল্য পরিশোধের পর প্লট হস্তান্তরের জন্য সুপারিশ করা হলে শেখ হাসিনা নিজ স্বাক্ষরে ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর প্লট হস্তান্তরের আবেদন করেন, যা অপরাধের অভিপ্রায় হিসেবে আদালতের কাছে বিবেচিত হয়।
বিচারক বলেন, শেখ হাসিনা নিজ স্বাক্ষরে ১২ সেপ্টেম্বর লিজ দলিল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন এবং ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে আরেকটি শপথছাড়া হলফনামা দেন, যেখানে নিজ নামে কোনো প্লট না থাকার কথা উল্লেখ থাকলেও স্বামী বা পরিবারের নামে বরাদ্দকৃত জমির তথ্য গোপন রাখা হয়। এ হলফনামাটিও আইনগতভাবে অকার্যকর ছিল। তথাপি রাজউক লিজ দলিল সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওইদিন রাজউক এবং শেখ হাসিনার মধ্যে প্লটের চুক্তি কালীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়।
বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ফাইনালি প্লট বুঝিয়ে দিতে দরখাস্ত দিলেন শেখ হাসিনা। সম্পদের প্রতি তার লোভ আছে। না হলে আবেদনটি ছুড়ে ফেলতে পারতেন। বলতেন, প্লট দরকার নাই; তা না করে (প্লট) বুঝে নিতে আবেদন করেন। পরে ০০৯ প্লটটি চূড়ান্তভাবে তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এখানে রাজউক এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় অন্যায় করেছে। শেখ হাসিনা অন্যায়ের সাথে জড়িত, প্রতারণা করেছেন। তিনি এটা না পেলে কোনো সৎ লোক হয়তো পেতেন।
পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, তিনি (শেখ হাসিনা) ৩ অগাস্ট প্লট পান। দুঃখজনকভাবে ৩১ অগাস্ট তিনি ছেলে জয়ের জন্য প্লটের রেকমেন্ড করলেন। তিনি একজন পলিটিক্যাল লিডার, চারবারের প্রধানমন্ত্রী। তার কেন এতো টাকা, এতো সম্পদ লাগবে? তারা এসব সম্পদ না পেলে তো অন্য কেউ পেতেন। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর তিনি তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্য প্লটের রিকমেন্ড করে চিঠি দিলেন। তিনিও (পুতুল) পেলেন। ছেলে-মেয়ের পর তিনি বোন, বোনের ছেলে-মেয়ের প্লটের জন্য রিকমেন্ড করলেন। গোষ্ঠী, এরিয়া, ডিস্ট্রিক্ট সবার জন্য রিকমেন্ড করা হয়েছে। মামলার বিষয়বস্তু না হওয়ায় এগুলো আর বললাম না। পরে আদালত একে একে তিন মামলার রায় দেন বিচারক। ১১টা ৫৬ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাস থেকে নেমে যান।
হাসিনা পরিবারের রায়ে হতাশ দুদক : প্লট দুর্নীতির মামলায় আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন না হওয়ায় হতাশ দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। গতকাল বৃহস্পতিবার রায়ের পর দুদকের কৌঁসুলি খান মো. মাইনুল হাসান লিপন বলেন, আমরা সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশা করেছিলাম, তা হয়নি। কমিশনের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অপর আইনজীবী সুলতান মাহমুদ বলেন, আদালত বলেছেন, সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিরুদ্ধে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৬১, ১৬৩, ১৬৪, ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা প্রমাণিত হয়নি। শুধুমাত্র দুদকের আইনের ৫(২) ধারা প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদের সাজা হয়েছে। আর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা ও দুদক আইনের ৫(২) ধারা প্রমাণিত হয়েছে। দণ্ডবিধির ১৬১, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা প্রমাণিত হয়নি। এই তিন মামলায় ১০৯ ধারা প্রমাণিত হলে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি খুরশীদ আলমের আইনজীবী শাহীনুর ইসলাম।