কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

বাকি আসামীরা হলেন— সেতু বিভাগের সাবেক সচিব ও নির্বাহী পরিচালক (অব.) খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (অব.) কবির আহমদ এবং সাবেক পরিচালক ও যুগ্ম সচিব আলীম উদ্দিন আহমেদ। বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে তিনটি অপ্রয়োজনীয় কাজ— পরিষেবা এলাকা, পর্যবেক্ষণ সফটওয়্যার ও একটি ট্যাগ বোট যুক্ত করার ফলে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৫৮৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ উপেক্ষা করে এসব কাজ অনুমোদন দেওয়া হয়। মামলার এজাহারে বলা হয়, অভিযুক্তরা নিজেদের ও অন্যদের আর্থিকভাবে লাভবান করতে সুপরিকল্পিতভাবে অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ করে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করেন।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) ও অরুপ হংকং জেভি যৌথভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা জমা দেয়। ২০১৫ সালে সিসিসিসির প্রস্তাবিত ৬৭৯.১৬ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ৬৪৬ মিলিয়ন ডলারে ব্যয় ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের পর দেখা যায়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উল্লিখিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

দুদকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত টানেল দিয়ে চলাচল করেছে মাত্র ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৮৭৯টি যানবাহন, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের মাত্র ১৩.৫৯ শতাংশ। এই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা, অথচ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হয়েছে ২০৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, বিদেশি বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি সুলিভান, মাইকেল কান্টনার এবং আইইউটির অধ্যাপক ড. হোসেন মো. শাকিনও ওই তিন কাজের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেননি। তবুও মন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুমোদন দেওয়া হয়, যাতে জনগণের বিপুল ক্ষতি হয়।

দুদক আরও জানিয়েছে, আসামীরা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ), ২০০৬ লঙ্ঘন করে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ দেন, এতে সরকারের আরও ৫৫ লাখ ২১ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের ঘোষণা দেন। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু হয় এবং ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর টানেল উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কম রাজস্ব, অতিরিক্ত ব্যয় ও অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতা এ প্রকল্পকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।