রাজধানীর মিরপুরের জাহাজবাড়িতে জঙ্গী নাটক সাজিয়ে ৯ তরুণ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৬ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি এ মামলায় পলাতক ছয় আসামীর পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের আবেদন করেন। একইসঙ্গে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানির জন্য সময় চান। পরে শুনানির জন্য আগামী ৬ এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে, ২২ ফেব্রুয়ারি পলাতকদের হাজির হতে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন আদালত। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল তাদের হাজির হওয়ার কথা ছিল।
এ মামলায় গ্রেপ্তার দুই আসামী হলেন- সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল হক ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান মিয়া। শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহম্মদ মারুফ হাসান, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণ পদ রায় ও তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন।
গত ২৯ জানুয়ারি আট আসামীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে রাজধানীর কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ি নামে পরিচিত একটি বাড়িতে কথিত জঙ্গী আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। ‘অপারেশন স্ট্রম-২৬’ নামের ওই অভিযানে ৯ তরুণকে গুলী করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।
গুম করেনি, আত্মগোপনে ছিলেন: টিএফআই সেলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামী কর্নেল কেএম আজাদের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো জেরার সময় দাবি করেছেন, দীর্ঘ আট বছর আত্মগোপনে ছিলেন ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান। কোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তাকে গুম করেনি।
গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ জেরা অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলের অপর দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জেরায় ব্যারিস্টার আরমানকে আইনজীবী টিটো বলেন, আপনি আত্মগোপনে ছিলেন। কোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা গুম করেনি। এছাড়া আপনার লেখা 'আয়নাঘরের সাক্ষী, গুমজীবনের আট বছর' বইয়ে বর্ণিত সব বিবরণী মিথ্যা বলেছেন। জবাবে এসব সত্য নয় বলে জানান তিনি।
আলামত নিয়ে আমিনুল গণির প্রশ্নে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, আমার ঘাড়ের গামছা, পরনের লুঙ্গি ও টি-শার্টটি চেয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু সংরক্ষণ না করায় দিতে পারিনি।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব ধ্বংস করেছেন বলে জানতে চান আসামীপক্ষের আইনজীবী। প্রত্যুত্তরে আরমান বলেন, এটা সত্য নয়, আমার ঘাড়ের গামছা, পরনের লুঙ্গি ও টি-শার্টটি ধ্বংস করেছি।
জেরার সময় ট্রাইব্যুনালে ব্যারিস্টার আরমানের গুমজীবন নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। আসামীপক্ষের আইনজীবীর আবেদনে প্রদর্শিত ভিডিওর ১৯ মিনিট ৪০ সেকেন্ডে লুঙ্গি-টিশার্ট ও ঘাড়ে গামছা পরায় ছিলেন ব্যারিস্টার আরমান। যেটি সিসিটিভির ফুটেজ থেকে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী টিটো বলেন, প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্দেশেই আপনি এসব পরেছেন। জবাবে সাক্ষী বলেন, এটা সত্য নয় যে, প্রামাণ্যচিত্র বানানোর উদ্দেশে এসব পরেছি। এতে পরিহিত পোশাকের ফুটেজটি মূল সিসিটিভি থেকে নেওয়া।
এরপর লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেমসহ সাত আসামীর পক্ষে জেরার জন্য সময় চান আইনজীবী তাবারক হোসেন। এ সময় আপত্তি জানান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। পরে জেরার জন্য আগামী ১০ মার্চ দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদী, সুলতান মাহমুদসহ অন্যরা।
এদিকে, রোববার সকালে এ মামলায় গ্রেপ্তার ১০ আসামীকে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল কেএম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), র্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো. মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম।
শেখ হাসিনা ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন- শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ, র্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ ও র্যাবের সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. খায়রুল ইসলাম।
হানিফের মামলায় ১৬ সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ ফের ১০ মার্চ : জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা শেষ হয়েছে। পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১০ মার্চ দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদের একক বেঞ্চে এ সাক্ষ্যগ্রহণ হয়।
১৬তম সাক্ষী হিসেবে এদিন সাক্ষ্য দেন তদন্ত সংস্থার লাইব্রেরিয়ান এসআই আনিসুর রহমান। জবানবন্দীতে তিনি এ মামলা সংক্রান্ত কোথায় থেকে কী জব্দ করেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তুলে ধরেন। পরে পলাতক আসামীদের পক্ষে তাকে জেরা করেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার ও সহিদুল ইসলাম সরদার।