ঢাকার মতিঝিলে রুমমেটকে হত্যার পর লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার শাহীন আলমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডের পাঠিয়েছে আদালত। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের শুনানি নিয়ে গতকাল সোমবার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাকসুদুর রহমান রিমান্ডের এ তথ্য জানিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল থানার এসআই মো. শাহরিন হোসেন তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে মাকসুদুর রহমান এবং কাওছার আহম্মেদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তবে আসামীর পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পরে আদালত শাহীনের পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়।
এর আগে মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানিয়েছিলেন ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও বিতণ্ডার জেরে ৩০ বছর বয়সী মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহকে হত্যা করে তারই রুমমেট শাহীন। শাহীন গত দুই মাস ধরে ওবায়দুল্লাহর সাথে জসীমউদ্দিন রোডে একটি ছয়তলার বাসায় থাকছিলেন। পরবর্তীতে সে ‘হীরাঝিল হোটেলে’ কাজ শুরু করে।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ভিকটিম ওবায়দুল্লাহ বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করতেন। চাকরির সুবাদে ঢাকার মতিঝিলের কমলাপুর কবি জসীম উদ্দিন রোডেরএকটি চিলেকোঠায় দুই রুমের একটি মেসে শাহীন আলমসহ ভাড়া থাকতেন। শাহীন আলমের সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য ছিল। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শাহীনের সাথে তার ঝগড়া হত। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ টা ৪৩ মিনিটের দিকে ছোট ভাই জলিলের সাথে ওবায়দুল্লাহর মোবাইল ফোনে কথা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে পল্টনের আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীত পাশে কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় একটি বিচ্ছিন্ন পা, বায়তুল মোকারম মসজিদের পূর্ব গেটের পাশে বিচ্ছিন্ন দুটি হাত এবং শাহজাহানপুর থানাধীন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশে আরেকটি বিচ্ছিন্ন পা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে পুলিশ বিচ্ছিন্ন হাত দুইটি উদ্ধার করে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ের মাধ্যমে ওবায়দুল্লাহর পরিচয় শনাক্ত করে। পুলিশ পরবর্তীতে ওবায়দুল্লাহর ভাড়া মেসের ঠিকানা পেয়ে সেখানে যায়। সেখানে গিয়ে একটি রক্তমাখা ধারালো চাপাতি ও সিসি ক্যামেরা ফুটেজ পর্যালোচনায় একটি বাইসাইকেল উদ্ধার করে। একপর্যায়ে পুলিশ শাহীনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নেয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে শাহীন ওবায়দুল্লাহকে হত্যা করে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে মৃতদেহ বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দিয়েছে মর্মে স্বীকার করে। পুলিশ যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল বর্জ্য নিষ্কাশন কেন্দ্র থেকে ওবায়দুল্লাহ বিচ্ছিন্ন মাথা, সাভারের আমিনবাজার সালেহপুর ব্রিজের নীচে তুরাগ নদী থেকে শরীরে একাংশ উদ্ধার করে।
এঘটনায় ওবায়দুল্লাহর বাবা হামিদ মিয়া রোববার মতিঝিল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, শাহীন আলম ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টা ৪৩ মিনিট থেকে ১টা ৫২ মিনিটের মাঝে কোনো এক সময়ে ওবায়দুল্লাহকে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এবং মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ কেটে বিচ্ছিন্ন করে, লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ফেলে আসে।
মারার চিন্তা ছিল না আদালতকে বললেন শাহীন
রুমমেট মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহর চলাফেরা, আচর-আচরণ খারাপ লাগলেও তাকে মারার চিন্তা ছিল না বলে আদালতকে জানিয়েছে শাহীন আলম। আদালতে রিমান্ড শুনানিতে এ কথা বলেন ওবায়দুল্লাহ হত্যা মামলার এই আসামী। শাহীন আলমের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আসামীর কিছু বলার আছে কী না জানতে চান বিচারক। এ সময় নিশ্চুপ ছিলেন শাহিন।
বিচারক জানতে চান, মারছেন কেন ? তখনো নিশ্চুপ ছিলেন শাহিন। মারার কারণ কী জানতে চাইলে কিছু বলেনি শাহিন। কোনো কিছু বলার নাই? বিচারকের এমন প্রশ্নে মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করেন শাহিন। তিনি বলেন, হত্যার পরিকল্পনা ছিল না। কিভাবে হত্যাকাণ্ড হল বিচারকের প্রশ্নে শাহীন বলেন, আমার কাছে সবই সাধারন মনে হচ্ছিলো। তার চলাফেরা, আচর-আচরণ আমার খারাপ লাগত। লেনা-দেনা ছিল। সব বাদ দিয়েছি। তার আচর-আচরণ খারাপ ছিল। কিন্তু মারবো এমন চিন্তা ছিল না।
কিভাবে লাশের টুকরোগুলো ফেললেন বিচারক জানতে চাইলে শাহীন বলেন, প্রথমে সাইকেলে করে, পরে হেঁটে হেঁটে। এ ঘটনার পর আত্মসমর্পণ করার চিন্তা ছিল বলে আদালতকে জানিয়েছেন শাহীন। ঢাকায় কতদিন জানতে চাইলে শাহীন বলেন, সাড়ে চার মাস। বিচারক জানতে চান এলাকায় মামলা আছে কী না? শাহিন বলেন, না। এসময় বিচারক বলেন, ওই (হবিগঞ্জ) এলাকার মানুষ সুবিধার না।
পরে আদালত শাহীনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেয়। এরপর বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেন, বিষয়টি ক্রস চেক করবেন। ঘটনা কীভাবে ঘটলো, আর কেউ জড়িত ছিল কী না। একজন একা এভাবে হত্যা করা সম্ভব, অবিশ্বাস করার কিছু নাই। ক্রসচেক করার জন্য রিমান্ড। রিমান্ড দেওয়া সঠিক তদন্তের জন্য।