‘২০০৭ সালের ১/১১-তে সেনা সমর্থিত সরকারে আমার ভূমিকা ছিল দেশ রক্ষা করা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়া। আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নির্যাতনে জড়িত ছিলাম না।’ গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এ কথা বলেছেন হেফাজতে থাকা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ডিজিএফআইয়ের সাবেক ডিজি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ বলছেন, ১/১১’ সরকারের সময়ে ২০০৭-৮ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্যে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া তারেক রহমানের কারামুক্তির বিষয়েও তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। ডিবি পুলিশের হেফাজতে এই দুই জন পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা হয়ে তিনি কিভাবে কিংবা কোন আইনগত প্রক্রিয়ায় এ কাজগুলো করেছিলেন-তদন্ত সংশ্লিদের এমন প্রশ্নে সরাসরি কোন জবাব না দিয়ে মামুন খালেদ বলেন, তিনি যা করেছেন, সবই তারেক রহমানের জন্যে করেছেন। বিএনপির উপকারের চেষ্টা করেছেন। নির্ভরযোগ্য-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। অন্যদিকে মাসুদ চৌধুরী অন্যদের উপর দোষ চাপিয়ে এখন বলছেন, মামার (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) উপকারার্থে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। বলছেন, জিয়া পরিবারের সদস্যদের উপকারের চেষ্টা করেছেন। তৎকালীন সময়ে তারেক রহমানের উপর মাসুদ চৌধুরীর ওপর নির্যাতন চালানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অন্য কর্মকর্তাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। গত বুধবার, ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসের নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় মামুন খালেদকে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম অভিযানে নেতৃত্ব দেন। তাকে গ্রেপ্তার করে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে সোপর্দ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন আদালত। ২০২৫ সালের মে মাসেই তার ওপর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তিনি মিরপুরের নিজ বাসভবনেই অনেকটা গৃহবন্দী ও আত্মগোপনের মতো অবস্থায় ছিলেন।

হাসিনার শাসনামলে ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক থাকাকালীন মামুন খালেদ সংস্থাটিকে একটি নিপীড়ক ও খুনে বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, ২০১২ সালে মেজর জিয়াকে গুম করার নেপথ্যে মামুন খালেদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। বিডিআর হত্যাকা-ের সময় আগাম তথ্য জেনেও ব্যবস্থা না নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেনা কর্মকর্তাদের জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। ১ হাজার ১ কোটি ৪০ হাজার টাকা নয়-ছয়েরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ১/১১’ সরকারের সময় চাঁদাবাজির মাধ্যমে কয়েক শ’ কোটি টাকা নিয়েছেন বলেও জানা যাচ্ছে। এসব বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের জেরার মুখে মামুন অর্থ লোপাটের কথা অস্বীকার করছেন। উল্টো বলছেন, সেনা বাহিনী ও কর্মকর্তাদের কল্যাণে তিনি আইনগত প্রক্রিয়ায় কাজ করেছেন। একটি আবাসন কোম্পানীর সঙ্গে জলসিড়ি প্রকল্পের বিষয়ে চুক্তির মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তাদের এক হাজার কোটি টাকাও বেশি অর্থ লোপাটের বিষয়ে তিনি বলছেন, কোম্পানীর মালিকের ১৫০০ কোটি টাকা উদ্ধার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মামুন জানান, তিনি কোনো অন্যায় করেননি। যা করেছেন, আইনগত প্রক্রিয়ায় করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির উপকারে কাজ করেছেন।

অন্যদিকে ওয়ান ইলেভেনের কুশীলব মাসুদ চৌধুরী শুক্রবার অন্যদের উপর দোষ চাপিয়ে এখন বলছেন, মামার (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) উপকারার্থে কাজ করার চেষ্টা করেছেন। বলছেন, জিয়া পরিবারের সদস্যদের উপকারের চেষ্টা করেছেন। তৎকালীন সময়ে তারেক রহমানের উপর মাসুদ চৌধুরীর ওপর নির্যাতন চালানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে অন্য কর্মকর্তাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নির্যাতন ও বিতর্কিত কর্মকা-ের দায় তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের তিন প্রভাবশালী কর্মকর্তাÑমেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। তিনি দাবি করছেন, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়ন এবং কিংস পার্টি গঠনের মূল কারিগর ছিলেন এটিএম আমিন। তবে তদন্তকারীরা নবম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি হিসেবে মাসুদের আক্রমণাত্মক ভূমিকার কথা জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। ক্ষেত্রবিশেষে অস্বীকার করছেন। জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুমা খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর অমানবিক নির্যাতনের যে অভিযোগ রয়েছে, তার মূল নির্দেশদাতা ছিলেন এ মাসুদ।

এর আগের দিন জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ চৌধুরী জানান, বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে মূল পরিকল্পনা তৈরি করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (‘র’)। এ বিষয়ে সংস্থাটি কাজে লাগায় তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাটি পরিকল্পনা শুরু করে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষদিকে। এদের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ব সংস্থাটির নামে ভুয়া চিঠি তৈরি করা হয়। সূত্র জানায়, এছাড়া আগের মতোই ডিবি পুলিশের পাঁচদিনের রিমান্ডে তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের বিভিন্ন জবাব এড়িয়ে যাচ্ছেন মাসুদ। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তসংশ্লিষ্টদের উল্টো বয়ান দিচ্ছেন। ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে তার ভূমিকা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তৎকালীন সময়ে নির্যাতন করা এবং মানবপাচার করে অর্থ উপার্জনসহ নানা অভিযোগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গত সোমবার, ২৩ মার্চ রাতে রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকা থেকে মাসুদকে আটক করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার ঢাকার পল্টন থানায় হওয়া মানব পাচার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তার পাঁচদিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করে। তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ওয়ান-ইভেলেনের কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে তা-ও তদন্ত করে দেখার কথা বলেছে পুলিশ।

জানা গেছে, মাসুদ চৌধুরীকে দ্বিতীয় দফায় আবারো রিমান্ডে নেওয়া হতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে ফেনীর মহিপালে গুলিতে ১১ জন নিহতের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর অন্যতম প্রধান আসামি তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে অন্তত ১১টি মামলা হয়েছে। এছাড়াও মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে তিনি গঠন করেছিলেন এক বিশাল সিন্ডিকেট। ‘ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ও তার সহযোগীরা প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের মামলা দায়ের হয়েছে। রিমান্ডে এ বিশাল অর্থের উৎস এবং গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নিরুত্তর থাকছেন অথবা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছেন।