ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলাটি করা হয়েছে রোববার রাতে ঢাকার তেজগাঁও থানায়। প্রথম আলোর করা এই মামলায় আসামী করা হয়েছে অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে।
একইদিন আরেকটি ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে হামলা হলেও এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি বলে জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম। তিনি গতকাল সোমবার দুপুরে বলেন, এখন পর্যন্ত প্রথম আলো মামলা করেছে, ডেইলি স্টারের মামলাটা প্রক্রিয়াধীন। কারণ তাদের কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তারা এটা নির্ধারণ করছে। অফিশিয়ালি এটা নির্ধারণ করার পরেই তারা মামলাটা করবে। তাদের টোটাল কি কি খোয়া গেছে, কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এই ফিগারটা তারা ফিগার আউট করতেছে।
পুলিশ বলছে, প্রথম আলোর করা মামলায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সময় কেবল লুটপাট করা সম্পদের মূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা; আর সবমিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৩২ কোটি টাকা বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে ডিএমপি ভিডিও ফুটেজ দেখে এই দুষ্কৃতিকারীদেরকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে এবং আমরা গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। নজরুল ইসলাম বলেন, হামলার ভিডিও বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত ৩১ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হল। গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. নাইম, মো. আকাশ আহমেদ সাগর, মো. আব্দুল আহাদ, মো বিপ্লব, মো. নজরুল ইসলাম মিনহাজ, মো. জাহাঙ্গীর, মো. সোহেল রানা, মো. হাসান, রাসেল ওরফে শাকিল, মো. আব্দুল বারেক শেখ আলামিন, রাশেদুল ইসলাম, সোহেল রানা, শফিকুল ইসলাম, মো. প্রান্ত ওরফে ফয়সাল আহমেদ প্রান্ত, আবুল কাসেম, রাজু হোসাইন ও মো. সাইদুর রহমান।
গ্রেপ্তারদের রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আমি খুঁজতে চাচ্ছি না, এরা দুষ্কৃতিকারী। তারা আইন ভঙ্গ করছে। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রচলিত যে আইন, যে বিচার ব্যবস্থা, সে বিচার ব্যবস্থায় তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। সে যে দলেরই হোক, যে মতেরই হোক। এই ১৭ জনের মধ্যে ১৩ জন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম-সিটিটিসি ৩ জনকে এবং গোয়েন্দা পুলিশ ১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্য থেকে নাইমের কাছ থেকে সেদিনের লুটের টাকায় কেনা টিভি, ফ্রিজ এবং নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে হামলার ঘটনার রাতে পুলিশ কেন নিস্ক্রিয় ভূমিকায় ছিল সেই ব্যাখ্যা দিয়ে মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ওই রাতে পুলিশের অ্যাকশনে নামতে না পারার কারণ হল, তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটত। মানুষের জীবনের কোনো ক্ষতি হয়নি-এটাকেই তারা অর্জন হিসেবে দেখেন বলে মন্তব্য করেছেন অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, যে কারণে ওখানে আমরা অ্যাকশনে যেতে পারি নাই, কোনো হিউম্যান লাইফের কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয় নাই। এইটা আমি বলব যে, এই এত বড় একটা ইনসিডেন্টের আমাদের এচিভমেন্ট। যে কোনো ধরনের ক্যাজুয়ালটি ছাড়া এটাকে ট্যাকল দেওয়া গেছে। সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করা হয়ত সম্ভব মন্তব্য করে তিনি বলেন, কিন্তু একটা হিউম্যান লাইফ যখন লস্ট হয়, এটা কোনো কিছুর বিনিময়ে আর ফিরায় আনা সম্ভব না। যে কারণে আমরা ওখানে অ্যাকশনে যাই নাই।
মব ভায়োলেন্স ঠেকাতে ডিএমপি কতটা সক্ষম, প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা সক্ষম। সবসময় সব ঘটনা আমরা কার্ভ করতে পারব, বিষয়টা এরকম না। কারওয়ান বাজারের যে ঘটনাটা, ওখানে যে অবস্থা ছিল, এইটার অন্তরালে আরো কিছু বিষয় আছে। আমরা যদি ওখানে অ্যাকশনে যেতাম তাহলে গুলী হতো, দুই-চারজন মারা যেত।
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছায়ানটের ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় ও উদীচীর ঘটনায়ও মামলা হইছে শাহবাগ থানায়, ওটা পরে ব্রিফ করব।
১৫ আসামী কারাগারে
এদিকে, দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ঢাকার মহানগর হাকিম সাইফুজ্জামান গতকাল সোমবার তাদের জামিনের আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সেলিম রেজা জানিয়েছেন। ওই আসামীরা হলেন- নাইম ইসলাম, সাগর ইসলাম, আহাদ শেখ, বিপ্লব, নজরুল ইসলাম ওরফে মিনহাজ, জাহাঙ্গীর, সোহেল মিয়া, হাসান, মোহাম্মদ রাসেল, আব্দুল বাকের শেখ ওরফে আলামিন, রাশেদুল ইসলাম, সাইদুর রহমান, আবুল কাশেম, প্রান্ত সিকদার ও রাজু আহমেদ।এর আগে, তাদের আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তেজগাঁও থানার পরিদর্শক আবদুল হান্নান। আসামি বিপ্লব ও হাসানের পক্ষে আইনজীবী হোসেন আহামাদ এবং অপর আসামিদের পক্ষে আইনজীবী এমদাদউল্লাহ মোল্লাহ, মো. আব্দুল্লাহ জামিন চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে জামিন আবেদন নাকচ করে আদেশ দেন বিচারক।